ইউক্রেনের পটপরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক ন্যুল্যান্ড আসছেন ঢাকায়

বাংলাদেশে আসছেন গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অফিসিয়ালরা। এই প্রথমবারের মত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ৪ সিনিয়র কূটনীতিক: তিন জন আন্ডার সেক্রেটারি, একজন এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি, এবং এরা সবাই খুব কামেল লোক।

এরা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড,

বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া,

অর্থনীতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি হোজে ডব্লিউ ফার্নান্দেজ, এবং

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু।

এখানে উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্রে নামকরণ সবকিছুই একটু উল্টোপাল্টা। বিশ্বে সর্বত্র যখন সরকারে মন্ত্রী থাকে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই পদটির নাম সেক্রেটারি, যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে তারা বলে সেক্রেটারি অব স্টেটস। তার অধীনে থাকে দু’জন ডেপুটি সেক্রেটারী, ঠিক তার নিচেই থাকে ছ’জন আন্ডার সেক্রেটারি (ইনারা বাংলাদেশের সচিব পর্যায়ের ব্যক্তি), তার অধীনে থাকে সহকারী সচিব (মানে সহকারী মন্ত্রী)। তো সরকারের ৬ জন আন্ডার সেক্রেটারীর মধ্যে ৩ জনকেই এবার ঢাকায় পাঠাচ্ছে। এর দ্বারা বুঝতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র কী করতে যাচ্ছে।

এরমধ্যে ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বিখ্যাত হয়ে আছেন ২০১৪ সালে ইউক্রেনে পটপরিবর্তন সফল করা নিয়ে, এবং ডোনাল্ড লু পাকিস্তানে ইমরান খানের অপসারনের সাথে। দুটো সরকার পতনই এত সিস্টেমেটিক ভাবে করা হয়েছে, যেন মনে হতে পারে, গানিতিক নিয়ম মেনেই তা হয়েছে।

২০১৪ সালের শুরুর দিকে পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে মর্যাদার বিপ্লব বা ‘ময়দান বিপ্লব’ নামে একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যাতে বিক্ষোভকারী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যে মারাত্মক সংঘর্ষের পর রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০১৩ সালের শুরুতে ইউক্রেনীয় পার্লামেন্ট ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগদানের জন্য চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য অনুমোদন করেছিল। এটি প্রত্যাখ্যান করতে রাশিয়া প্রবলভাবে চাপ প্রয়োগ করে এবং রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ তাতে সায় দেন। ফলে নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পরিবর্তে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রতিক্রিয়ায় বৃহৎ আকারের গণবিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে। গণবিক্ষোভ প্রবল হতে থাকে যাতে দাবী ওঠে রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। আজারভ সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার, অলিগার্কিদের প্রভাব, পুলিশি বর্বরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ হচ্ছিল। সরকার মিটিং মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তা বিক্ষোভকে আরও উস্কে দেয়। বিরোধী দলগুলি একযোগে সহিংস আন্দোলন শুরু করে, তাদের সাথে যোগ দেয় ৩ জন সাবেক প্রেসিডেন্ট।

প্রায় একমাস ধরে প্রচণ্ড গণআন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। ‘ময়দান বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত প্রতিবাদ শিবির মধ্য কিয়েভের স্বাধীনতা স্কোয়ার দখল করে। বিক্ষোভকারী এবং সরকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে ১০৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যায়, এবং আরও অনেকে আহত হয়। এক পর্যায়ে ঢাল এবং হেলমেট সহ কর্মীদের নেতৃত্বে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সংসদের দিকে অগ্রসর হয় এবং পুলিশ স্নাইপাররা তাদের উপর গুলি চালায়। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাজধানী কিয়েভে অবস্থিত স্বাধীনতা চত্বরসহ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ চালায়। রাজধানী থেকে আন্দোলন ধীরে ধীরে সারা দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ আর টানা অবরোধের কারণে সরকারি কার্যক্রমসহ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারি, ইয়ানুকোভিচ এবং সংসদীয় বিরোধী দল অন্তর্বর্তীকালীন ঐক্য সরকার, সাংবিধানিক সংস্কার এবং আগাম নির্বাচনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ কেন্দ্রীয় কিয়েভ ছেড়ে যায় এবং বিক্ষোভকারীরা নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর আগে জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পুলিশ প্রেসিডেন্টের বাসভবনটি ছেড়ে দিলে সেখানে বিরোধীদলীয় বিক্ষোভকারীরা প্রবেশ করে। প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকভিচ সেই সন্ধ্যায় শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। যদিও বিক্ষোভের শুরুতেই এটা সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে।


যেভাবে ইউক্রেনে পালাবদল ঘটান ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড

২০১৩ সাল থেকে ইউক্রেনে যখন সরকার বিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডকে বসানো হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ইরোপিয়ান এবং ইউরোএশিয়া ডেক্সের সহকারী মন্ত্রী হিসাবে। নতুন দায়িত্ব লাভের পরপরই তিনি সংকট সমাধানে ইউক্রেনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জিওফ্রে পাইটের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে কাজ করতে থাকেন। নিয়মিতভাবে আলোচনা ও পরামর্শ দানের পাশাপাশি নুল্যান্ড কিয়ভ সফর করেন কয়েকবার, ঢুকে পড়েন আন্দোলনরত শিবিরে। মূলত নুল্যান্ড ইউক্রেনের ‘মর্যাদার বিপ্লবে’র জন্য নেতৃত্বদানকারী মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন, যিনি প্রধান কূটনীতিক হিসাবে কাজ করতে গিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের রাশিয়ান সম্প্রসারণবাদের উপর কঠোর লাইন নিতে চাপ দেন। ২০১৪ সালে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের গ্যারান্টি সহ ইউক্রেনের জন্য ঋণের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ইউক্রেনীয় সামরিক ও সীমান্ত রক্ষীদের জন্য অ-মারাত্মক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নুল্যান্ড। তখন সেক্রেটারি অফ স্টেট জন কেরি এবং সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স অ্যাশ কার্টারের সাথে নুল্যান্ডকে ইউক্রেনে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের নেতৃস্থানীয় সমর্থক হিসাবে দেখা যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ট মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইউক্রেন সংকটে ইউরোপিয়ান নেতারা নিজ নিজ স্বার্থে বহুধাবিভক্ত ছিল, ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে সমন্বিতভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, যা নুল্যান্ডকে বিব্রত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ফলে বাধ্য হয়েই নুল্যান্ড জাতিসংঘকে ব্যবহার করেন। এমনকি তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উদ্দেশ্যে “ফাক ইইউ” শব্দটি প্রয়োগ করেন। এই আন্দোলনের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বার বার বলেছে যে, একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য সঙ্কটের সব পক্ষের সাথে কাজ করছে, কিন্তু বাস্তবে ‘মর্যাদার লড়াইয়ে’ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রধান দলের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রেখে গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়েই দেশটির ভবিষ্যত নির্ধারণ করেন। নুল্যান্ড কিয়েভে এসে বিরোধী তিন নেতার সাথে যেমন বৈঠক করেছেন, পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের সাথে হেসে হেসে কথা বলেছেন, কিন্তু ঘটনা যা ঘটার প্লান ছিল, সেটাই ঘটেছে। ইউক্রেনের গণতন্ত্রাতিক আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের প্রতি জোরালো সমর্থনের অংশ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ২০১৪ সালের ৩ মার্চ কিয়েভে যান বিরোধী দলের নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে।
 

কেবল পটপরিবর্তন ঘটিয়েই ক্ষান্ত হননি নুল্যান্ড, ২০১৬ সালে ইউক্রেনকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিচার শুরু করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন: “এটি এমন লোকদের আটকে রাখা শুরু করার সময় যারা ইউক্রেনের জনসংখ্যাকে অনেক দিন ধরে ছিঁড়ে ফেলেছে এবং এটি দুর্নীতির ক্যান্সার নির্মূল করার সময়”।

You Might Also Like