৩৬ জুলাই: যেভাবে প্রতীকী ক্যালেন্ডার হয়ে উঠল জাতীয় প্রতিরোধের হাতিয়ার

বাংলাদেশে ব্যাপক ছাত্র-আন্দোলন ও দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে সোমবার পতন ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরব্যাপী শাসনের। আন্দোলনকারীরা এ দিনটিকে ৫ আগস্ট নয়, বরং প্রতীকীভাবে ঘোষণা করেছেন “জুলাই ৩৬” হিসেবে — একটি মানসিক ও কৌশলগত প্রতিরোধের প্রতীক, যা তাদের আন্দোলনের সময়কালকে সম্প্রসারিত করেছে।

আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র আন্দোলনকারীদের “রাজাকারদের নাতি” বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্য দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

শামসুল আলমের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ থেকে নেয়া

প্রতিবাদ ক্যালেন্ডারের নতুন সংজ্ঞা:
“জুলাই ৩৬” ধারণাটি প্রথম প্রবর্তন করেন মোঃ শামসুল আলম, বাংলাদেশ সরকারের সিনিয়র আমলা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে নির্বাসিত অবস্থায় বাংলাদেশের স্বৈরাচার হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সামাজিক মাঝ‍্যম ব‍্যহবার করে তিনি তার চিন্তাভাবনা, বয়ান, শ্লোগান, নানা পরামর্শ, আন্দোলন পরিচালনার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। সংগ্রামীদের সাথে নিহিড় যোগাযোগে ছিলেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি প্রচার করেছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মধ‍্যে স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটবে।

এরপরে মধ‍্য জুলাই থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে সরকারী বাহিনীর ও গুন্ডাদের আক্রমনের মুখে শত শত শিক্ষার্থী আহত/ নিহত হতে লাগল প্রতিদিন। আন্দোলনের ছন্দ পতন ঘটলেও আবার ঘুরে দাড়ায়। কিন্তু দেখা যায় জুলাই মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ হাসিনা সরকারের পতন না ঘটায়, তিনি ফেসবুকে ঘোষণা দেন: “বিজয়ের আগ পর্যন্ত জুলাই মাস বাড়িয়ে দেয়া হলো। আজ ৩২, আগামীকাল ৩৩… এভাবে মুক্তির ক্যালেন্ডার শেষ হবে যেদিন হাসিনার পতন ঘটবে সেদিন। এই প্রতীকী ক্যালেন্ডার দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্লোগান হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে: “হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হবে না।” আন্দোলনের একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তায় রূপ নেয় এই নতুন ক্যালেন্ডার।

গণভবন ঘেরাও:
সোমবার, লক্ষ লক্ষ মানুষ “ঢাকা অভিযাত্রা” কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীতে সমবেত হন, যা মূলত ৬ আগস্টের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখে এটি একদিন এগিয়ে আনা হয়। ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ঘেরাও করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন “গণভবন”, যেটিকে আন্দোলনকারীরা “বাংলাদেশের বাস্তিল দুর্গ” হিসেবে উল্লেখ করেন।

ঐদিন ঢাকার বিকেলে সেনাপ্রধান সহ একাধিক সরকারি সূত্র নিশ্চিত করে যে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। রাজধানী শহরজুড়ে আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ে মানুষ। শাহবাগ, টিএসসি এবং মতিঝিল এলাকায় জাতীয় পতাকা ও স্বাধীনতার স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ।

পূর্বাভাস ছিল আগেই:
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন—যেটিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক বলা হয়েছিল—তার পর থেকেই সরকারের পতনের পূর্বাভাস আসতে থাকে।
জনাব শামসুল আলম জানান, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও কূটনৈতিক সূত্র তাকে জানিয়েছিল যে হাসিনা সরকার ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরে আর টিকবে না। “যখন জুলাই পেরিয়ে গেল, আমি আমার আত্মিক অনুভূতিকে বিশ্বাস করলাম এবং জুলাই মাসকে পতন অবধি বাড়িয়ে দিলাম,” নিউ ইয়র্ক থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন আলম।” এই প্রতীকী ঘোষণা আন্দোলনকারীদের জন্য একটি মানসিক রণকৌশলে রূপ নেয়—এবং ইতিহাস তার নিজপথে চললো।”

বাংলাদেশের সামনে নতুন অধ্যায়: শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশে আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকে এটিকে “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজ ইতিমধ্যে ‘জুলাই ৩৬‘-কে জাতীয় মুক্তি দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানিয়েছে—যা সাধারণ জনগণের প্রতিরোধের শক্তিকে উদযাপন করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নতুন নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে।

মার্কিন স্যাংশনের চাপে অর্থমন্ত্রী লোটাস কামালের পদত্যাগ?

বাংলাদেশের বিনাভোটের সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পদত্যাগ করেছেন। গতরাতে পদত্যাগ পত্র প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন লোটাস কামালের পাঠানো লোক। খবর বিশ্বস্ত সুত্রের। তবে এই মুহুর্তে লোটাস কামাল সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। সুত্রটি জানায় পদত্যাগ পত্রে যদিও স্বাস্থ্যগত কারণ লেখা হয়েছে, তবে ভেতরের কারণ হলো মার্কিন ট্রোজারী ডিপার্টমেন্ট কতৃক বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাবের ওপরে দেয়া স্যাংশন এবং এর বহুবিধ প্রভাব এবং সরকারের পদত্যাগের চাপ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না, তাই প্রথমেই বিদায় নিলেন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট ব্যবসায়ী এই অর্থমন্ত্রী। ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাস থেকে তিনি শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। স্মরণযোগ্য, ১৯৮৪ সালে সেনাশাসক জেনারেল এরশাদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে দেশ থেকে লন্ডন পালিয়ে যান মুহিত, এবং সেখান থেকে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন।

নানা অভিযোগ রয়েছে লোটাস কামালের বিরুদ্ধে। গত ২০১৮ সালের নৈশ নির্বাচনের আগে নৈশ নির্বাচনের আগে কুমিল্লা ১০ নাঙ্গলকোটের বেতাগাঁও বিএনপি জামায়াতের ৫০টি বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে লোটাস কামালের লোকজন। https://www.youtube.com/watch?v=vDYE1tn7AM8
এছাড়াও ২০১১ সালের শেয়ারবাজারে লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সালমান এফ রহমান, মন্ত্রী ফারুক খান, লোটাস কামালসহ সরকারের ঘনিষ্ঠজন জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস কোম্পানিটি প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৬৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এ কোম্পানিটিকে হঠাৎ করেই ২০০৯ সালে লাভজনক কোম্পানি হিসেবে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিবরণী পাল্টে দিয়ে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনে আবেদন করে। কিন্তু হিসাব জালিয়াতি করেও প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর শর্ত পূরণ করতে পারেনি সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস। পূর্ববর্তী ৩ বছরে কোনো কোম্পানি লোকসানে থাকলে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে পারে না। কিন্তু সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সাড়ে ৭ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে। অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলসের মূল্য সংবেদনশীল নানা ধরনের তথ্য প্রচার করে কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে অত্যন্ত চড়া দরে বোনাস শেয়ার বিক্রি করে আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে গেছেন। এছাড়া কোনো নিয়মনীতি না থাকা সত্ত্বেও বিএসইসি ২০১০ সালে ৮টি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন দেয়। এসব কোম্পানি অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমেও হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়। পরে তিনি কোম্পানীটি বিক্রি করে দেন।