নির্বাচনের আমেজ নেই, বড় আন্দোলনের শঙ্কা

ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা৷ সেই হিসাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৩ মাস বাকি। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির মাঠে উত্তাপ নেই৷ কোরবানিতে কিছু জনসংযোগ আর মাংস বিতরণ হলেও তাতে নির্বাচনী রাজনীতি জমেনি৷ ক্ষমতাসীন দলও বড় ধরনের কোনো সভা-সমাবেশের কোনো কর্মসূচি দেয়নি এবারের ঈদে। নির্বাচন নিয়ে এ মুহূর্তে দেশবাসীর মাঝে কোনো আগ্রহ নেই। ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নির্বাচন ঘিরে এখন পর্যন্ত আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং সবার চিন্তা নির্বাচন হবে তো? কেমন নির্বাচন হবে? ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি হবে না তো? বিশেষ করে, ক্ষমতাসীনদের প্রধান বিরোধী জোট বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল বর্তমান সরকারের অধীন নির্বাচনে যাবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। আর বিএনপি ছাড়া আওয়ামী লীগের শক্ত কোনো প্রতিপক্ষও নেই। তাই নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যেও তেমন কোনো তৎপরতা ছিল না ঈদকে ঘিরে। বরং সবার মাঝেই আছে নানা সংশয় ও শঙ্কা। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন হওয়ার। যে আন্দোলনে বিএনপিসহ ক্ষমতার বাইরে থাকা সব দল রাজপথে নামতে পারে। সে লক্ষ্য নিয়েই জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধারণা করা হচ্ছিল এবার নির্বাচনের আগে সর্বশেষ ঈদে নির্বাচনী রাজনীতি জমে উঠবে৷ আর তা অব্যাহত থাকবে নির্বাচন পর্যন্ত৷ কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি৷ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী রাজনীতিবিদরা বরাবরের মতই এলাকায় ছিলেন৷ কিন্তু সেটা তারা সাধারণ নিময়মেই গেছেন৷
কেউ কেউ একটির জায়গায় দু’টি অথবা যিনি দু’টি গরু কোরবানি দিতেন তিনি হয়তো তিনটি দিয়েছেন। তবে তাতে তেমন নির্বাচনী আমেজ ছিল না৷ জনসংযোগ বা ভুড়ি ভোজের আয়োজনেরও তেমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি৷ যদিও শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নামে কোরবানি দিয়েছেন দলীয় নেতারা৷
এবার আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতা-কর্মীদের যার যার এলাকায় ঈদের সময় থাকার নির্দেশ দেন৷ সবাইকে নিয়ে ঈদ করার কথা বলেন৷ বিএনপিও কেন্দ্রীয়ভাবে একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিল৷ কিন্তু তাতে বাড়তি কোনো প্রভাব পড়েনি৷
স্থানীয় পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে না থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কীরকম হবে- সেটা নিয়ে সংশয় আছে৷ তাই আগেই মনোনয়নপ্রত্যাশীরা জনসংযোগ ও ভোটের আশায় নানা খাতে অর্থ খরচে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না৷ তারা আরো অন্তত এক মাস দেখতে চান৷ অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান তারা৷
এদিকে বিএনপি- খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে কিনা, সে নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি৷ যদিও তারা এখনো বলছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না।
বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘‘বিএনপি খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাবে না৷ তাই নির্বাচনের আগে তার মুক্তির জন্য যা যা করণীয় তা দল করছে এবং করবে৷ আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে৷ প্রস্তুতিও চলছে৷ আর আন্তর্জাকিভাবে চাপ সৃষ্টির প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে৷ আমাদের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷”
বিএনপির ওই নেতা বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আগামী মাসে ২১ অগাস্টের গ্রেনেড মামলার রায় হবে৷ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছেন- ওই রায়ের পর বিএনপি আরেকটি সংকটে পড়বে৷ এতে বোঝা যায় এই রায়ও পূর্ব নির্ধারিত৷ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে কনভিক্টেড করা হবে৷ যেভাবে খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে৷”
নির্বাচন কমিশন আগামী অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা বলেছে৷ আর নির্বাচনকালীন সরকারও ওই মাসেই গঠিত হওয়ার কথা৷ ওই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের আকার হবে ছোট৷ সরকারে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধি নেয়া হতে পারে৷ তবে এই সরকারের প্রধান থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷
বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, ‘‘আমরা চাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার৷ তাই নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু৷ দেশের মানুষের মনে এখনো নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে৷ তারা নিশ্চিত নয় যে, নিজেদের ভোট দিতে পারবেন কিনা৷ তাই নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি৷”
এদিকে নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্য নিয়ে নানা তৎপরতা আছে। ড. কামাল হোসেন এবং বি চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা চলছে৷ সেখানে বিএনপি থাকবে বলেও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। তবে বিএনপিকে ওই জোটে থাকতে হলে জামায়াতের ব্যাপারে অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে৷ আর তাদের ওই জাতীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব কে দেবেন- তা এখনো অমীমাংসিত৷ জোট হলেও তারা নির্বাচনসহ কয়েকটি ইস্যুতে আন্দোলনে যাবেন৷ মূলত, সেই জোট ও আন্দোলন কেমন হবে সে দিকেই এখন দৃষ্টি দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের।
অপরদিকে বাম দলগুলোও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামার কথা বলছে৷ এর বিপরিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের পরিধি আরো বাড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে৷ যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে আগেই কাজ শুরু করেছে৷ কিন্তু নির্বাচনের আগে বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেয়? তাদের এবং তাদের শরীকদের রাজনৈতিক তৎপরতা কোন দিকে যায়? তা দেখেই আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেবে৷ নির্বাচনের আগে সরকার দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দিতে চায় না- যা নতুন কোনো সংকটের তৈরি করে৷ এজন্য নানা ধরনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে৷ বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মনিটরিংকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার৷
অবশ্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, ‘‘কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই দেশের নির্বাচনী রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে৷ দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখন নির্বাচনমুখী৷ তারা আগামী নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত৷ সব দল এখন নির্বাচন নিয়ে কথা বলছে৷ ফলে দলগুলো যে নির্বাচনী কাজ শুরু করে দিয়েছে তা স্পষ্ট৷”
এক প্রশ্নের জবাবে খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘‘নির্বাচন হবে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে৷ এ নিয়ে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা করলে লাভ হবে না৷ বিশৃঙ্খলা করলে কি পরিণতি হয় তা গত নির্বাচনে তারা দেখেছে৷”
২০১৪ সালের ৫ জানুযারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ বাংলাদেশের এই সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত জোটসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে৷ তাদের ছাড়াই ওই নির্বাচন হয়। এতে দেড়শতাধিক ব্যক্তি বিনাভোটে এমপি নির্বাচিত হন৷ ওই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে৷
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি এবার আওয়ামী লীগকে সেই সুযোগ না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও কীভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে বিএনপি তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। ফলে সব দলের অংশগ্রহণে, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
/শীর্ষনিউজ
