মালয়েশিয়া মডেলে জোট ও নির্বাচন আসছে: সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র
আ.লীগকে হটাতে বাংলাদেশে “মালয়েশিয়া মডেল” এর আত্নপ্রকাশ ঘটছে খুব শীগগিরই! এর সারমর্ম হলো শেখ হাসিনাকে গদি ছাড়া করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী তরতে আওয়ামী লীগ এবং জামাতকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের ইশতেহার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। এই আলোচনার উদ্যোক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং সুশীল সমাজ।
গুঞ্জনটা ডানা মেলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে দেশের রাজনীতিতে যেন একটা শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ গড়ে ওঠে তেমন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই। নানা রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবীদের নানা মত। কাজেই পথও অসংখ্য। কিন্তু কোনোভাবেই যেন পথ পাচ্ছিল না-কীভাবে গড়ে উঠতে পারে এমন একটা রাজনৈতিক জোট। অবশ্য ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এ ভূমিতে জোটগত রাজনীতির এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বর্তমানে জোটবদ্ধভাবেই রাজনীতির ময়দানে ক্রিয়াশীল। এরপরও যেন পথ মিলছিল না কিছুতেই। গত মে মাসে মালয়েশিয়ার নির্বাচন যেন বাতলে দিল পথ। সেই নির্বাচনে ৯২ বছরের বুড়ো মাহাথির মোহাম্মদ স্রেফ ভেলকিবাজি দেখালেন। তার ‘মালয়েশিয় মডেলের সুনামি’ তাক লাগিয়ে দিল বিশ্বকে। বাংলাদেশেও রাজনীতির এবড়ো-থেবড়ো ময়দানেও সেই ঢেউ এসে যেন ধাক্কা খেল। বলছিলাম, বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন আলোচ্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কথা। প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন আপাতত এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্র। ৮১ বছর বয়সী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক সময়কার ঘনিষ্ঠজন কামাল হোসেন বর্তমানে গণফোরামের সভাপতি হলেও ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আবার তিনি বর্তমান আওয়ামী সরকারের কঠোর সমালোচকও। তাকে সামনে নিয়েই এগুচ্ছে এ প্রক্রিয়া। জাতীয় ঐক্য নামে এ প্রক্রিয়ার ধরন ও রূপরেখা অনেকটাই পরিষ্কার হবে আজ মঙ্গলবার। কারণ, কামাল হোসেনের বাসায় এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা রাজনৈতিক দলের নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা বসছেন আলোচনায়। এর আগে গত পরশু অবশ্য কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকা জোট যুক্তফ্রন্টে কামাল হোসেন থাকছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। আর ইঙ্গিতও দিয়েছেন বড় রাজনৈতিক জোট গড়ার। আর এই ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া মডেলকে অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে যাই হোক, মালয়েশিয়া মডেলের এই আলোচনা রাজনৈতিক নেতাদের টেবিল থেকে এখন কর্মী ও সাধারণ মানুষের মুখে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মাহাথির মোহাম্মদ আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক। বিরোধী মত দমন, একনায়কতান্ত্রিক শাসনসহ নানা দুর্নাম তার ঘাড়ে থাকলেও তিনি তার শাসনামলে মালয়েশিয়াকে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন। আর সেটা অনেকটাই শূন্য থেকে শুরু করে চূড়ায় ওঠা। দেশপ্রেম, প্রশাসনিক দুর্নীতি হটানো, মার্কিন-চীনসহ বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে দেশের স্বার্থে একচুলও ছাড় না দেওয়া-এসব গুণের কারণে তিনি মালয়েশিয়ার জনগণের নয়নের মণি থেকেই রাজনীতি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন। কিন্তু যে মালয়েশিয়া তিনি রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকে দেশটি অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে ৬২ বছর একটানা ক্ষমতায় বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) পার্টি। মাহাথির-পরবর্তী যুগে সেই দলেরই শাসনকালে দুর্নীতি এবং বিদেশি শক্তিগুলো বিশেষ করে চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য গেড়ে বসে। ২৫৩ বিলিয়ন ডলার দেনায় ডুবে যায় দেশটি। বিভাজন বাড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার জন্য একের পর এক কালাকানুন চালু হয়। জনগণের মাঝে চাপিয়ে দেওয়া হয় করের বোঝা। আর শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হয় শিক্ষা ঋণ থেকে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সম্পদ লুণ্ঠনের অভিযোগ ওঠে। এ পরিস্থিতিতে একচেটিয়াভাবে ক্ষমতায় থাকা বারিসান ন্যাশনাল পার্টির বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত, আনোয়ার ইব্রাহিমের দলই ‘পাকাতান হারাপান’ নামে জোট গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেন। তবে বিরোধী দলগুলোর দরকার ছিল এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ও অবিতর্কিত। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এরকম অবিকল্প একজনই। তিনি মাহাথির মোহাম্মদ। যদিও ক্ষমতায় থাকাকালে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা আনোয়ার ইব্রাহিমকে সমকামিতার অভিযোগে তিনিই ক্ষমতাচ্যুত ও কারারুদ্ধ করেন। এ অপরাধে কারাদণ্ড হয় তার। জোট গড়ার পর আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার আচরণ ভুল ছিল বলে স্বীকারও করেন মাহাথির। নির্বাচনী প্রচারণায় তার এই ভুল স্বীকার ভোটাররা ইতিবাচক হিসেবেই নেন। আর ৯২ বছর বয়সে তিনি যখন দুর্নীতি উচ্ছেদ, মতপ্রকাশে কালাকানুন বাতিল ও গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতিশ্রুতি দেন সেটি সাদরে গ্রহণ করে জনগণ। এর বিপরীতে নাজিব রাজাকদের নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল উন্নয়ন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতে ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে পিষ্ট মালয়েশিয়ার জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠরা উন্নয়ন মেনিফেস্টোকে বেছে নেয়নি।
মালয়েশিয়ার ইতিহাসে বারিসান ন্যাশনাল পার্টির ক্ষমতা একচেটিয়া ও নিরঙ্কুশ। সেখানে বিরোধীদের অবস্থান উল্লেখ করার মতো ছিল না। বলা হয়ে থাকে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি ছিল বারিসান ন্যাশনালের পক্ষে। আর ভোটের আগে করা সব ধরনের জরিপই বলছিল আবারও ক্ষমতায় আসবে তারা। কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোট সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়।
মালয়েশিয়ার এই মডেল সারা বিশ্বের রাজনৈতিক মহলে বেশ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে বিশ্লেষকদের মাঝে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে যখন দক্ষিণপন্থা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের জোয়ার সে মুহূর্তেই মালয়েশিয়া সংসদীয় গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতার বদলের একটা নতুন দিশা যেন দেখাচ্ছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি এ রকম একটা উদ্যোগ নিতে গিয়েছিলেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছিল। কংগ্রেসের সেক্যুলার রাজনীতির ধারক হওয়া সত্ত্বেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী আরএসএসের সভায় যোগ দেওয়ার পর এ নিয়ে শোরগোল শুরু হয়। ৮২ বছর বয়সী প্রণবের যুক্তি, তিনি বহুত্ববাদে বিশ্বাসী, এ কারণে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে ভারতের রাজনৈতিক মহলে জোর শোরগোল প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার অপূর্ণতা থেকেই এমনটা করেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে মাহাথির মোহাম্মদ হয়তো স্বপ্ন দেখিয়েছেন তাকে।
ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে যে জাতীয় ঐক্য হতে যাচ্ছে সেখানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে বিএনপিকে। বিএনপি বলয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকরা এ জাতীয় ঐক্য গঠনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের আশা, দেশ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে বৃহত্তর এ জোটে থাকছে ডা. বি চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ স ম রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্টও। এ ছাড়া বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মতো দলও এ জোটে ভিড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরুর আগেই সরকার পতন না রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনএ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে অন্যদের কিছুটা মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য কিংবা যে জোটই হোক বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দান কিন্তু মসৃণ আর একমুখী নয়। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কোনো সরকার ও রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে পারেনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আর দেশি-বিদেশি নানা সমীকরণে বহু দল, বহু মত একসঙ্গে একই লক্ষ্যে কাজ করার নজিরও এখানে বিরল। তাই নয়া এ জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে তা দেখতে ভবিতব্যের অপেক্ষা। তবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির ময়দানে শোরগোল তুলেছে ‘মডেল মালয়েশিয়া’।
/ খোলা কাগজ
