জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ বাকী থাকতেও হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ নিয়ে গুরুতর আইনী বিতর্ক

সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের সর্বসম্মত রায় থাকার পরেও এবং আগের রায় বাতিল না করেও কোন প্রক্রিয়ায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দিচ্ছে? ভোটের এক সপ্তাহের কম সময় বাকী থাকলেও উচ্চ আদালত এখনও প্রার্থী কাটাছেড়া করছেন! তাহলে নির্বচন হবে কি করে? এ নিয়ে আইনবিদরা কি বলবেন?

ঘটনা ও রায়
————–+
১৯৯৬ সালের ৫ই জুন আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চের দেয়া রায়ে বলা হয়েছিল, কোনো নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে রিটের মাধ্যমে দুটি ব্যতিক্রম বাদে আার কোনো বিরোধের ফয়সালা হবে না। যা হবার নির্বাচনের পরে হবে। আর তাও রিটে নয় নির্বাচনী বিরোধ হিসেবে সুরাহা হবে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল ছিলেন অথর জাজ। প্রধান বিচারপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, বিচারপতি বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী এবং বিচারপতি মোস্তফা কামালের সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে ওই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন।

আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে ৪১ ডিএলআরে বর্ণিত এ এফ এম শাহ আলম বনাম মুজিবুল হক এবং অন্যান্য মামলার বরাত দিয়ে বলেছিলেন, এই আদালত অর্থাৎ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় এই নীতি নিশ্চিত করেছেন যে হাইকোর্ট বিভাগের অধীনে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় কোনো একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালে কোনো পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। শুধুমাত্র দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এর একটি হচ্ছে, দেখাতে হবে যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা নির্বাচন কমিশন নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে তাদের যথাযথ এখতিয়ার ছিল না। একে বলে কোরাম নন জুডিস। দেখাতে হবে, রিটার্নিং অফিসারের বা ইসির নিয়োগ বৈধ ছিল না। দ্বিতীয়ত যেটা দেখাতে হবে, সেটা হলো মেলিস ইন ল অর্থাৎ যে আইনের আওতায় সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে, সে আইনটি বিদ্বেষপূর্ণভাবে প্রণীত হয়েছিল।

এই দুটি শর্তের বাইরে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিধানের অধীনে রিট দিয়ে কোনো বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সেই নীতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত করেছে এবং আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পর্যন্ত সময়ে সেই নীতি আইনিভাবে কখনোই বদলে যায়নি। বিচারপতি কামাল লিখেছিলেন, এই নীতি সংসদের মতো সমানভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্যও প্রযোজ্য হবে।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল লিখেছিলেন, প্রতীয়মান হচ্ছে যে রিটার্নিং কর্মকর্তা তার অধিকারের মধ্যে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দণ্ডিত এবং দণ্ডিত থাকা বিষয়ে তার আপিল বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং দণ্ডিত থাকা চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেনি। কারণ তার আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

আপিল বিভাগ আরো লিখেছিলেন, দণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা সেই বিষয়ে যদি সংবিধানের আওতায় অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকে, সেটা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে তুললে চলবে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দিতে হবে এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের সামনে নিবার্চনী দরখাস্ত হাতে প্রতিকার চাওয়ার জন্য আসতে হবে। এই বিষয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় পরখ করার কোনো সুযোগ নেই। হাইকোর্ট বিভাগের উচিত হবে না এই বিষয়ে কোনো মতামত প্রদান করা। সুতরাং যখন রিট দরখাস্ত করা হয়েছিল তখনই তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল আরো লিখেছেন, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে দরখাস্তকারী এ কে এম মাঈদুল ইসলাম এরশাদ নমিনেশন পেপার দাখিল করেছিলেন কিন্তু রিটার্নিং অফিসার এরশাদের নমিনেশন গ্রহণ করেন। এর বিরুদ্ধে একই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী মাঈদুল ইসলাম হাইকোর্টে এসেছেন। রিট দরখাস্তে বলা হয়েছে যে, এরশাদ বিভিন্ন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে নানাবিধ মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। একটি মামলায় তিন বছর একটিতে সাত বছর, অপরটিতে ১৩ বছর দণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু নমিনেশন পেপার যাচাইয়ের সময়ে বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়। তিনি আরো নিবেদন করেন যে, এরশাদ আপিল করেছেন সেটা ঠিক কিন্তু তা স্থগিত হয়নি। তাই সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ধারা অনুযায়ী তার নমিনেশন পেপার বৈধ বলে গণ্য হতে পারে না।

উল্লেখ্য, ওই মামলায় খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ একেএম মাইদুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। তিনি নিবেদন করেছিলেন যে হাইকোর্ট ডিভিশন এটা বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন যে এরশাদের দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়নি। তাই তার নমিনেশন পেপার গ্রহণ করা বৈধ হয়নি। আপিল বিভাগ একথায় সায় দেননি।

উল্লেখ্য যে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বেগম খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার সপক্ষে বলে চলছেন, দুই বছরের বেশি কারো দণ্ড হলেই হলো, তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।  অথচ সুপ্রিম কোর্টের নজির বলছে ভিন্ন কথা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.