বাঙালির টেরানটুলাঃ গণপিটুনির আতঙ্কে হঠাৎ শুরু হতে পারে গণ আত্মহত্যা
- মাসুম সাঈদ খান
পনের শতকের ঘটনা। জার্মানির এক নান গীর্জার অন্যান্য নানদের হঠাৎ কামড়াতে শুরু করলেন। ব্যস আর যায় কোথায়? কামড়ের বিনিময়ে কামড় দিতে গিয়ে সেই গীর্জা এবং তার আশেপাশে কামড় ছড়িয়ে পড়লো। একসময় সমগ্র জার্মানি জুড়ে প্রতিটি গীর্জায় শুরু হয়ে গেল কামড়ানোর প্রতিযোগিতা। দেখতে দেখতে তা ছড়িয়ে গেল হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস সহ আশেপাশের দেশগুলিতে। তবে ইউরোপ বলে কথা। তারা কামড়ালেও তা শিল্প হয়ে যায়! তাই কামড়া কামড়ির এ ঘটনার বেশ চমৎকার একটা নাম দেয়া হয়েছিল, st.Vitus dance. তবে কামড়কে যারা শিল্প মনে না করে উন্মত্ততা বলে তর্ক করতে চাইবেন তাদের সমালোচনা থেকে জার্মানিকে বাঁচানোর দায়িত্ব স্বয়ং আমার। হ্যা, এ উন্মাদনার শুরুটা কিন্তু জার্মানিতে নয়, ইতালিতে হয়েছিল।
এক ধরনের বিষাক্ত মাকড়শার কামড়ানোর ভয় থেকে এ উন্মাদনার শুরু হয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, #terantula নামের সে মাকড়শাকে কেউ দেখেনি, কিন্তু তার ভয়ে সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে লাগলো। শুধু তাই নয়, মাকড়শার ভয়ে খাওয়া ঘুম ছেড়ে দেয়ায় ইতালির অধিকাংশ মানুষ উন্মাদের মত আচরণ শুরু করলো এবং পরষ্পরকে কামড়াতে শুরু করলো। আবার কামড়ানো শেষে তারা উন্মাদ নৃত্য করতো। এ ঘটনার জন্য অনেক নিন্দুক ঐতিহাসিক তৎকালিন ইতালির শাসকগোষ্ঠীর ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাকে দায়ী করে থাকেন। তবে নিন্দুকদের কথায় কান না দিয়ে আমি এমন গণ উন্মাদনার মনস্তাত্বিক বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে এ ধরনের গণ উন্মাদনাকে মনোবিজ্ঞানে #terantism বলা হয়ে থাকে।
ঢাকার শাহবাগে গণ জাগরণের নামে দীর্ঘদিন যে উন্মাদ নৃত্য হয়েছিল, সে ঘটনা অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে? ইতালির সে টেরানটুলা মাকড়শার মত ভয়ঙ্কর ভেবে এবং ঘটনার আদ্যোপান্ত না জেনে তখন অনেকেই ‘ফাঁসি চাই’ শ্লোগানে সারা দেশ কাঁপিয়ে তুলেছিল। উন্মাদ নৃত্য ও হিংস্র শ্লোগানের সে উন্মত্ততা তখন মিডিয়া সহ অনেককেই ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সে উন্মাদনার মধ্যে ছিলো দলবদ্ধ নৃত্য, অবিরত চিৎকার ও উত্তেজনার লাফালাফি। মানুষের বুকের উপর দাড়িয়ে লগি বৈঠার নৃশংস নৃত্য, সোনার ছেলেদের নৈমিত্তিক কোপাকুপি ও হাতুড়ি পেটানোতেও আমরা এমন মনোবিকার দেখতে পেয়েছি! হ্যা, এ ধরনের লক্ষণগুলো সামনে রেখে মনোবিজ্ঞান এমন উন্মত্ততার নাম দিয়েছে #Mass_histeria। বাংলায় এর নামকরণ হতে পারে গণ হিস্টিরিয়া!
প্রাচীনকালে গ্রীক দেবতাদের পূজার সময় এক ধরনের খুল্লাম খাল্লাম নৃত্যের প্রচলন ছিলো। পরবর্তী যুগের গণ উন্মত্ততা ও নৃত্যশিল্প সে মনোবিকারের পরিবর্তিত ও বিকশিত রুপ বলা চলে। মনোবিজ্ঞানী হলিংসহেড ও রেডলিক এমন গণ উন্মাদনা নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। তারা এ উন্মাদনার সামাজিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একে কৃষ্টিজনিত মনোবিকার ( #cultur_bound_psychosis) নামে আখ্যায়িত করেছেন। আর এ ধরনের মনোবিকার সৃষ্টিতে তারা একটি জাতির গুজব সৃষ্টির অভ্যাস, হুজুগে মাতা মনোভাব, সন্দেহ প্রবণতা, অলীক বিশ্বাস ও বিচারের অক্ষমতাকে দায়ী করেছেন। হুজুগে বাঙালির সাথে এমন বিশ্লেষণ কি দারুনভাবেই না মিলে যায়! মনোবিকারের এমন বিশ্লেষণ থেকে বাঙালি জীবনে চলমান গুজব ও হিংস্রতার কারণ খুব সহজেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি। ইতালির মানুষ টেরানটুলার ভয়ে হিংস্র আচরণ করতো, কিন্তু বাঙালির হিংস্রতা দেখে মনে হয় তারা প্রত্যেকেই আজ একেকজন টেরানটুলায় পরিনত হয়েছে। এদেশে প্রতিষ্ঠিত ভয়ের সংস্কৃতির যে আবহ তৈরি হয়েছে সেটি গণ উন্মাদনা ও গণপিটুনি থেকে আগামীতে গণ আত্মহত্যায় রুপ নিতে পারে।
পাপুয়া নিউ গিনি ও মালয় উপদ্বীপের একাধিক উপজাতির মধ্যে একটা অদ্ভুত মনোবিকার দেখতে পাওয়া যায়। এ মনোবিকারের শুরুতে লোকজন উন্মাদের মত আচরণ করতে থাকে, এরপর ধারালো অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে একে অপরকে আঘাত করতে থাকে। প্রচুর রক্তপাত ও নৃশংসতা শেষে তাদের একপক্ষ বিজয়ী হয় এবং দিনের পর দিন সে বিজয় নিয়ে তাদের বীরত্ব ও গৌরব প্রকাশ করতে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিজয়ী পক্ষ নিজেদের নৃশংসতার কথা পরবর্তীতে একেবারেই ভুলে যায় এবং আগের ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে প্রতিপক্ষের উপর পুণরায় হামলা চালায়। জংলিদের এ ধরনের মনোবিকারকে মনোবিজ্ঞানীরা Amnesia বলে থাকেন। তবে মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের মনোবিকারকে বিরলপ্রজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এমন মনোবিকার কি সত্যিই বিরল? বাঙালির গৌরবের ইতিহাসের সাথে এ বিকারগ্রস্ততার মিল কি একেবারেই নেই?
