পতনের ধ্বনি
ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ
দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচক নিম্নমুখী।
অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ পুরুষ শ্রমিক বাজারের ক্রমাগত সংকোচনের মূখে,শুধুমাত্র প্রবাসী নারী শ্রমীকদের উপর ভর করে রেমিটেন্স প্রবাহ এখনও ঠিক আছে বটে, তবে নির্যাতনের মুখে এই বাজারও ঝুকিপূর্ণ হয়ে গেছে। মাত্র এক বছরের মধ্যেই রেমিটেন্স প্রবাহে মন্দা শুরু হতে পারে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সাথে শ্রমবাজার খোলার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো মালয়েশিয়ার “ব্যাক ফর গুড” কর্মসূচীর আওতায় প্রায় ৩২ হাজার প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরতে নিবন্ধন করেছেন। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও ফেরত আসছেন প্রচুর শ্রমিক।

অব্যহত বাজেট ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি প্রকল্পের নামে অতি উচ্চ খরচ ও বেপারোয়া লুটে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির গতি লাগামহীন। বিপরীতে আয় নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছে রাজস্ব খাত। ভ্যাট, আয়কর ও বিভিন্ন শুল্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আসলে টেনে হিঁচড়ে যা বাড়ানো যেত, তা বাড়ানো হয়ে গেছে। সরকার বিএনপি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেয়ে রাজস্ব কর, মূসক ও শুল্ক আয় অন্তত তিনগুণ বৃদ্ধি করে বিশাল ক্রেডিট নিয়েছে। এটা করতে গিয়ে ব্যবসা ও বাজারের স্থিতিস্থাপকতা ভেঙে দিয়েছে। যেহেতু দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ ভাগের উপরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে আসে, তাই বেশি সংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে রাজস্বের আওতায় নিয়ে আসায় কর্মসংস্থান চাপে পড়ে গেছে। বেকারত্ব অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।

বেশ কিছু খাতে ভ্যাটের অতি চাপে বহু ছোট কোম্পানি বসে গেছে। সাইফুর রহমান ও শাহ কিবরিয়া সাহেবদের রক্ষণশীল ভ্যাট কর ও শুল্ক নীতির কারণে বহু খাত প্রতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আসেনি। বর্তমান সরকার এটার সুবিধা বড্ড বেশি নিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে আয় বাড়ানোর বিপরীতে অতি দ্রুত আয় বাড়াতে গিয়ে সরকার বিপদে পড়েছে। বছর বছর অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা করে বাজেট ব্যয় বাড়াতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে আয় ব্যয়ের ঘাটতি বা বাজেট ঘাটতি আর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিশাল আকারের বাজেট দিয়ে এখন আয় নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি প্রায় ২০ হাজার ২২০ কোটি টাকা। এই চার মাসের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের সামান্য বেশি, অথচ এবার গত অর্থবছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। বিগত বছরে মোট রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি। একটি প্রান্তিকেই যেখানে ২০ হাজার কোটি ঘাটতি, সেখানে চার প্রান্তিক (কোয়ার্টার) মিলে ঘাটতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

এদিকে রপ্তানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। শুধু মাত্র অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল। পরের চার মাসে টানা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায় অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৯৬৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ শতাংশ কম আর গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে ৩ শতাংশ কম। বিগত অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি আয় ছিল ১৭০৭ কোটি ডলার, কিন্তু বর্তমান অর্থ বছরের একই সময়ে তা মাত্র ১৫৭৭ কোটি ডলার, ৭.৫৯ % কম। এটা সরকারের টার্গেট থেকে ১২,৫৯% কম। অন্যদিকে শুধু নভেম্বরেই ১০.২০% রপ্তানি কম হয়েছে, বিগত বছর থেকে, যা সরকারের টার্গেট থেকে ১৭,৯% কম। এদিকে গত ছয় মাসে ৪৬ টি গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে, চাকরী হারিয়েছেন ২৫ হাজার শ্রমিক।
পেনশন ফান্ড ঋণ, সঞ্চয়পত্র ঋণ, বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি খোলা হয়েছে ব্রিটেনে বাংলা বন্ড নামে প্রবাসী বন্ড, এর আগে খোলা হয়েছে এনারবি বন্ড। ঋণের উৎস তৈরি করতে অর্থ মন্ত্রণালয় যেন পাগল হয়ে গেছে। সরকারি ঋণ খাত যেন ফারাক্কার খুলে দেয়া বাঁধ। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ব্যাংক থেকে ৪৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার, যা পুরো অর্থবছরে ব্যাংক ঋণে বাজেট প্রাক্কলনের প্রায় সমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত অর্থবছর-২০২০ এর তৃতীয় কোয়ার্টারের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, মাত্র তিন মাসে নিট মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ ৩৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২,৭% বেশি। এই হারে ঋণ বৃদ্ধি কোন মতেই টেকসই দেশজ উৎপাদন, রাজস্ব আয় এবং টেকসই অর্থনীতির বৈশিষ্ট হতে পারে না।
একই অবস্থা বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের, বর্তমানে খেলাপি ঋণের মোট স্তিতি প্রায় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা, এই টাকা দিয়ে প্রতিটিতে ২০ হাজার কোটি করে খরচ করে অন্তত ১২টা পদ্মা সেতু করা যায়। তবে আইএমএফ বলছে সবমিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ হবে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা।
