বাংলাদেশ কি তার জনসংখ্যা ও জন্মহার চুরি করে?

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

‘৫ম আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১’ এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী (জুন ২০১১ এ প্রকাশিত) বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১,৩৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গুলো এই সংখ্যাকে প্রশ্ন বোধক বলে প্রত্যাখ্যান করে। উপরন্তু আদমশুমারির তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকা প্রতিষ্ঠান “বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিআইডিএস”ও এই ফলাফল সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে। জুন ২০১২ সালে বাংলাদেশের জনগণনা সংশোধন করে বলা হয়েছে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার। এই সংখ্যা আদমশুমারির প্রাথমিক ফলাফল থেকে প্রায় এক কোটি মানুষ বেশি। এখানে দেখানো হয়েছে বিগত দশকে জনসংখ্যা ১,৫৮% করে বেড়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির নতুন বার্ষিক হার ১,৩৭ শতাংশ।

অর্থাৎ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১,৩৪ থেকে ১,৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এই ডেটা প্রশ্নবোধক। পরে আবারো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নতুন একটা জন্ম হার দিয়ে (১,৩৭% এর বিপরীতে ১,২৭%) কিউমেলেটিভ হিসেবে করে ২০১৮ সালে নতুন জনসংখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছে। বিবিএস দেশে ১,২৭ শতাংশ জন্মহারের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের জনসংখ্যাকে বর্ধিত করে ২০১৮ জানুয়ারিতে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হয়েছে বলে দেখিয়েছে। এই হিসাবে বর্তমানে এই সংখ্যা ১৬ কোটি ৬৫ লাখের মত।

ঠিক কিভাবে ১.৫৮% হারের জন্ম হার গুণশুমারির ১ম গণনায় ১.৩৪, সংশোধিত গণনায় ১.৩৭ হয়ে গেল? উপরন্তু জুন ২০১২ এর মাত্র এক বছর পরে এসে জুন ২০১৩ তে ঠিক কিভাবে আবার দেশের জন্ম হার আরো কমে বর্তমানে ১.২৭% হয়ে গেল?

আমরা এখানে বেশ কিছু বিষয়ের ফয়সালা চাই- 
১। বাংলাদেশের আদমশুমারি গৃহ গণনা কেন্দ্রিক। বাংলাদেশে নদীভাঙ্গনে নাগরিক বাস্তুচ্যুত হন। অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা, ঋণ ও অভাব অনটনে পড়ে বাস্তুচ্যুত হন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বশত ল্যান্ড ডিস্প্লেইস্মেন্ট ও এখানে ব্যাপক। তাই ভাসমান জনসংখ্যা এখানে বেশ বর্ধিত এবং ব্যাপক শহুরে বস্তির অস্তিত্ব বিদ্যমান। যেহেতু বস্তিবাসী ও ভাসমান নাগরিক প্রতিষ্ঠানিক ঠিকানা নেই ও তাই বিশাল বাস্তুহীন নাগরিকের ঠিক কি পরিমাণ গণশুমারিতে এসেছে সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। 

ধারণা করা হচ্ছে, এই চুরিকে ধামাচাপা দিবার জন্য, গণশুমারি ডেটাকে বিশ্বাস যোগ্য শুনানর জন্য এখানে কিছু হাইপ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তা হচ্চে, সামনের গণশুমারিতে নাসার জিয়াইএস ডেটা নেয়া হবে, সেজন্য তাদেকে হাজার কোটি টাকা পে-করা হবে। কিন্তু জিয়াইএস ডেটা বাড়ি ঘর নির্ণয়ে বস্তিবাসী ও ভাসমান নাগরিক শনাক্তকরণে কোন ভূমিকা রাখবেনা বলেই জিআইএস বিষেজ্ঞগণ মত দিয়েছেন। তদুপরি নাসার জিআইএস একুরেসি’র চেয়েও বেশি একুরেসির জিয়াইএস ডেটা বিদ্যমান। 

প্রশ্ন হচ্ছে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অটোমেটিক না করে, এর প্রসেস ঠিক না করে, ভোটার কার্ড, স্মার্ট এনাইডির পিছনে এত বছর ধরে এত এত ব্যয় করার করে ঠিক কেন এখন জিয়াইএস ডেটা লাগবে জনশুমারি করতে? তাইলে ন্যাশনাল ডেটা বেইজে যে জনসংখ্যার তথ্য ভান্ডার আছে সেটার বিশ্বাসযোগ্যতা নেই কি?  

২। ১,২৭% জন্ম হারে বছরে ২১ লক্ষ শিশু জন্ম নিবার কথা। অন্যদিকে ১,৫৮ শতাংশ হারে ২৬ লক্ষ। কিন্তু বেসরকারি ডেটায় বছর প্রতি ৩০ লাখ শিশু জন্মের প্রাক্কলন করা হয়।

কিন্তু আমরা যদি ২০১৮ সালের পিএসসি ও ইবিটি পরীক্ষায় ( প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায়) ৩০,৯৫, ১২৩ জন শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে এরও বাইরে রয়েছে ঝরে পড়া, শিক্ষা বঞ্চিত এবং বেশ কিছু প্রতিবন্ধি ভাগ্যতাড়িত শিশু। উল্লেখ্য ওয়ার্ল্ড প্রি-ম্যাচুরিটি ডে’তে উপস্থাপিত ডেটা বলছে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শিশু সময়ের আগে বা অকালে জন্ম নেয় যা প্রতি ৭টি শিশুর মধ্যে একটি, এই হিসেবেও মোট জন্ম সংখ্যা ৩০ লাখের কিছু বেশি হবার কথা।

যেহেতু ৩০ লক্ষ শিশু পঞ্চমের পরীক্ষাতেই অংশ নিচ্ছে তাই এটা হলফ করে বলা যায় শিক্ষা বঞ্চিত, ঝরে পড়া এবং প্রতিবন্ধি শিশু ৩০ লক্ষ থেকে বেশি।

অর্থাৎ সরকার এখানে জন্মহার কমিয়ে দেখাচ্ছে।

যদি জন্মহার পূর্বের দশকের মত ১,৫৮ শতাংশও হয়, তাহলে ১৬ কোটি ৩৫ লাখ ৫০ হাজারের বিপরীতে শিশু জন্ম ২৬ লক্ষ হবার কথা। তাহলে ডেটা মিলছে না কেন। এই জন্য যে জনসংখ্যা বেইজই সমস্যা আছে। তাহলে প্রকৃত জনসংখ্যা কত? যদি ধরি জন্ম হার ১,৫৮% এবং জনসংখ্যা সাড়ে ১৮ কোটি তাহলে বাৎসরিক শিশু জন্ম ৩০ লক্ষ হতে পারে। এই হিসেবে সরকার প্রায় ২ কোটি জনসংখ্যা কমিয়ে দেখায়। আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি দেশের মোট ছিন্নমূল, ভাসমান এবং বস্তিবাসী জনসংখ্যা ২ কোটি হয় কিনা? তাহলেই এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে (সমীক্ষা-১) যে, বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকের সংখ্যাও চুরি করে।

আর যদি সরকার দাবি করে, জন্মহার ১,৫৮ থেকে কম, তা হলে বর্তমান জনসংখ্যার বেইজ ১৯ কোটির মত হবে। 
৩। স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। এর পরের ৪২ বছরে দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে তিন গুণ বেশি; ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় চার কোটি মেট্রিক টন। ৪৫ বছরে ধান উৎপাদন তিনগুণের বেশি। কিন্তু বাংলদেশ প্রধান খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ নয়, বরং প্রায় বছরেই প্রধান প্রধান খাদ্য শষ্য কেনা লাগে। খাদ্য শস্য তিনগুণের বেশিতেও যেখানে কুলায় না, সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঠিক কিভাবে মাত্র ২.২ গুণ হয়। এত খাদ্য কে খায়? আজকের মানুষ কি ১৯৭২ থেকে মাথাপিছু হারে দ্বিগুণ ভাত খায়? বাস্তবতা তো বলে মানুষ এখন কম ভাত খায়। তাহলে কি অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ ভাত খায় না? (যা সরকার দেখায় তার চেয়েও বেশি) 


৪। জনসংখ্যা বৃদ্ধি গণনার সবচাইতে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে জন্ম গ্রহনের মাত্র কয়েকদিনের নবজাতক শিশু নিবন্ধন করে তাকে এলাকা ভিত্তিক নাগরিক আইডি দিয়ে দেয়া। একই সাথে মিরত্যু নিবন্ধন করা। 
বাংলাদেশ এই দুটি কাজে কখনও মনোযোগ দেয়নি। ন্যাশনাল আইডির বদলে ভোটার আইডি নামক প্রাপ্ত বয়স্ক আইডি নিয়ে এক্তরফা কাজ করছে যদিও দেশে ভোট বলে কিছু নেই।

দেখা যাচ্ছে মোট জন্ম নেয়া শিশুর এক চতুর্থাংশও নিবন্ধনে আসছে না, তথাপি সরকার নির্বিকার।

এখানে দেশটির জন্ম নিবন্ধনে অনীহার বিষয়টি স্পস্ট, কেননা সঠিক জন্ম নিবন্ধন জনসংখা চুরির মুখোশ খুলে দিবে। এবং এতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, প্রকৃত জাতীয় আয়, অতি দারিদ্র এবং দারিদ্রের সংখ্যার আসল ডেটা উন্মোচিত হয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে।

৫। যদিও জনসংখ্যা কম করে দেখানোয় গড় মাথাপিছু ঋন বেশি দেখাচ্ছে। কিন্তু সরকার যেহেতু জানে যে আসলে মাথপিছু ঋন বাস্তবে এত বেশি নয়, তাই সরকারও তার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা কখনও গড় মাথাপিছু আয়ের উল্লম্ফনকে সামনে আনেন না। 

২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ সাড়ে ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে (জুন ২০১৯) দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৬৮ হাজার। গত ১ বছরে যা বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার ২৩৩ টাকা। আগামী ১ বছরে তা আরও ৫ হাজার ৫৪৭ টাকা বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। যেভাবে ব্যাংক ঋণ বাড়ছে, মাথাপিছু ঋণ এই প্রাক্কলনের চেয়েও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

কথা হচ্ছে, আট-নয় বছরেই একটা দেশের মাথাপিছু ঋন সাতগুণ বাড়তে পারে কিনা? এখানে আরো গুরতর বিষয় হচ্ছে, এই সাত গুণ মাথাপিছু ঋন বৃদ্ধির সাথে অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের সামঞ্জস্য আছে কিনা? 

রাজস্ব আয়, রেমিটেন্স আয়, রপ্তানি আয়ের সংখ্যা গুলো ও বাজেট ব্যয় একই রেখে, কোন দেশের অফিশিয়াল জনসংখ্যা এক কোটিরও বেশি কম দেখানো গেলে তার ডেভেলপমেন্ট ইন্ডেক্স খুব ভালো দেখাবে, বাংলাদেশেরও তাই দেখাবে, কোন সন্দেহ নাই। ভাগ অংকে ভাজ্যকে (রাজস্ব অর্থনীতি কিংবা বাজেটের ব্যয়) একই রেখে যদি ভাজক (জনসংখ্যা) ছোট করে দেয়া হয়, তাহলে ভাগফল (আয়ের সূচক) বড় হয়ে যাবে। এটাই বাংলাদেশের “সূচকে” উন্নতি, মাথাপিছু আয়য়ে উন্নতির অন্যতম বড় একটা এলিমেন্ট। এই অপবুদ্ধিব্রিত্তিক স্ট্যাটিস্টিক্সের অপকৌশল থামাতে সঠিক জনসংখ্যা এবং জন্ম হার নির্ণয় খুব জরুরি।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.