দুর্গাপুজার ইতিহাস
কিভাবে এলো দুর্গাপুজা, বিষয়টা সবার জানা দরকার, নইলে যেভাবে যাচ্ছে মুর্তিতো বসেই গেছে, ১ যুগ পরে হয়ত এই দেশেই ’জাতীয় বাবা’ পুজা শুরু হয়ে যাবে। প্রতিবেশি দেশে ইতোমধ্যেই ‘মোদি ঠাকুরের’ নামে মন্দির হয়েছে, তাই এখানেও সতর্ক থাকা জরুরী!
দুর্গা পুজার ইতিহাস নিয়ে Bangladesh Arya Samaj-বাংলাদেশ আর্য সমাজ -চট্রগ্রাম, রাংগুনীয়া শাখার নিবন্ধটি পড়ে দেখা যাক:
দুর্গা পুজার ইতিহাস! দূর্গা পূজার কথা বাল্মীকি রামায়ণে নেই, তারপরও আমরা বাঙ্গালীরা এর পেছনে ছুটছি অবলীলায়! এখন প্রশ্ন হল কখন থেকে দুর্গা পূজা এই বঙ্গে চালু হল? চলুন দেখি। দুর্গা পূজা বাঙ্গালীদের সৃষ্টি, আর ভারতের সর্বত্র এই পূজাকে মূলত আমরাই জনপ্রিয় করে তুলেছি। ১৫৮০ সালে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা ছিলেন কংস নারায়ন খাঁ (সূত্রঃ বঙ্গভাষা ও সাহিত্য -ডঃ দীনেশ সেন)। তিনি যজ্ঞ করতে মন স্থির করলেন, তার পুরোহিত এবং সভাপন্ডিত রামেশ চন্দ্র শাস্ত্রী তাকে জানালেন- “চার রকমের যজ্ঞ আছে যথাঃ ১. রাজসূয় ২. রাজপেয় ৩. বিশ্বজীৎ ও ৪. অশ্বমেদ যজ্ঞ। এর মধ্যে ১ম তিনটা চক্রবর্তী রাজাদের করণীয়, আর অশ্বমেধ যজ্ঞ কলিতে চলেনা। তবে আপনার ইচ্ছা পূরণের জন্য ঐসব যজ্ঞেরই মত এক মহা আড়ম্বরময় মহাপূজার ব্যবস্থা আমি করে দেব।” এই বলে তিনি বর্তমানে প্রচলিত দুর্গা পূজার সমস্ত পদ্ধতি, মন্ত্র ও নিয়ম তৈরি করে দিলেন! রাজা কংসনারায়ন খাঁর ঐই দুর্গা পূজায় তখনকার দিনেই প্রায় আট লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন (উক্ত রাজার বংশধর কাশী ধর্ম মহামন্ডলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রাজা শশি শেখরেশ্বর রায়ও প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র দেখিয়ে এই কথা সমর্থন করেছেন)।
সারা বাংলাতেই ঐ মহাপুজার সংবাদ বায়ুর বেগে ছড়িয়ে পড়ল, আর এই দিকে অন্য রাজারাও নিজেদের ঐশ্বয্য, আড়ম্বর ও পৌরুষ দেখাবার জন্য এই ব্যয়বহুল পূজার অনুষ্ঠান করতে লাগলেন। মহাকবি কৃত্তিবাস ছিলেন ঐ কংস নারায়ণ রাজারই সভাকবি। তিনি তার রচিত রামায়ণে তার অদ্ভূত কল্পনা এবং কবিত্বের বর্ণাঢ্য আলোকসম্পাতে রামচন্দ্রকে দিয়ে অকালবোধন ইত্যাদি কল্পকাহিনী রচনা করেন। সারা দেশে যেখানে দূর্ভিক্ষে মানুষ খেতে পায় না, সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে এই মুর্ত্তিপুজা করাটা কতটা শুভ বুদ্ধির পরিচয় বহন করে??? রাস্তার পাশেই দেখা যায় ভাতের অভাবে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে জীবন্ত মাতারা, আর আমরা প্রাণহীন একটা মুর্তিকে মা মা বলে ওনার সামনে সাজিয়ে রাখি হরেক রকম খাবার! গলিতে গলিতে চাঁদা তুলে (আমাদের বাসায় এসেও মাতৃপূজারী সংঘ ৫০০টাকা নিয়ে গেছে ! প্রতি দিন এমন আরো অনেক আসছে।) জড়মুর্তি পুজার নামে আনন্দময়ীর আবাহনের প্রহসন করে চলছে! কী নিষ্ঠুর পরিহাস! . তথাকথিত ব্রাহ্মণরা এসে চন্ডীমন্ডপে উচ্চঃস্বরে পাঠ করেন- “যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা, নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ”, আর তোমরা পুজারীরা অশ্রুর বন্যায় ভাসীয়ে দাও পূজা মন্ডপ! দেখে মনে হয় … । কিন্তু অদূরেই ছিন্নবস্ত্রে ছোট কঙ্কালসার শিশুকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন যে রক্তমাংসে গড়া ক্ষুদারূপী মাতৃমুর্তি! আর তার ব্যাথায় তোমাদের চোখের জল আসে না! বরং পুজা মন্ডপের পবিত্রতা যাতে রক্ষা পায় তার জন্য তাকে বাইরে আটকে রাখার জন্য প্রহরী রাখা হয়!!! অথচ এই মুর্তিপুজারীরাই (প্রায়ই) এক একটা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে দুর্গা মাকে তুষ্ট করার জন্য পাগলের মত নাচে পুজা মন্ডবের সামনে!!! আর আমরা সকলেই সেই নৃত্য দেখি দাঁড়িয়ে! বাহ, কি দরুণ!!! . ধন্য মুর্ত্তিপুজারীরা, ধন্য!!
https://www.facebook.com/1715670705313282/posts/1759288557618163/
এ সম্পর্কে ভাবনা (Thoughts) গ্রুপে Sankarshan Upadhyay লেখা:
পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। সিরাজ হেরে গেলেন, জিতল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাংলার ধনসম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল লুটেরারা। এদের অন্যতম নবকৃষ্ণ দেব। The Corporation That Changed the World: How the East India Company Shaped the Modern Multinational’ শীর্ষক বইয়ে লেখক নিক রবিনস লিখেছেন সিরাজের রাজত্বের পতনের পর বাংলার তোষাখানা লুট করতে ব্রিটিশদের সাহায্য করেন নবকৃষ্ণ। রাতারাতি “৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপো, এবং গয়নাগাঁটি” ভাগ করে নেন তাঁরা নিজেদের মধ্যে। ইংরেজদের পক্ষ নেওয়ার জন্য পেলেন নবকৃষ্ণ পেলেন ‘রাজা বাহাদুর’ খেতাব; অতঃপর ১৭৬৬ সালে ‘মহারাজা বাহাদুর’। সবথেকে বড়ো কথা, গোটা সুতানুটি অঞ্চলের তালুকদার হয়ে গেলেন তিনি। সামান্য মুনশী থেকে বিশাল সাম্রাজ্য ও ধন-দৌলতের মালিক— এমনই চমকপ্রদ উত্থান রাজা নবকৃষ্ণ দেবের।
https://www.facebook.com/groups/2000118743332714/posts/5088514317826459
১৯৯৭-এর ৫ই অক্টোবর কলকাতার আনন্দবাজার’ পত্রিকার রবিবাসরীয়তে ‘ক্লাইভের দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক নির্মল কর উল্লেখ করেছেন : “নবকৃষ্ণ দেব ছিল ইংরেজদের চাকর। কোনো সময় ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রাইভেট টিউটর। উন্নতি করে হয়েছিল তালুকদার, চার হাজারি মনসবদার। পলাশীতে সিরাজের পতনে যারা সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিল নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র আর কলকাতার নবকৃষ্ণ দেব।” অঢেল টাকা এসেছে , এবার চাই খানিকটা সম্মানও। ক্লাইভ নবকৃষ্ণকে বোঝালেন কলকাতায় একটি বিজয় উৎসব করার জন্য। ‘হিন্দু ভাবাবেগ’ রক্ষা পেয়েছে বলে কথা! নবকৃষ্ণ তখনই বাংলার বাসন্তীপূজোকে এগিয়ে এনে লাগিয়ে দিলেন “দুর্গাপূজা”।
এর আগে শরৎকালে নবপত্রিকার পূজো প্রচলিত ছিল। রাজা শশাঙ্কের রাজত্বকালে বাংলায় শিব পুজোর প্রচলন ছিল, দুর্গা পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় না। পাল যুগে বাংলায় বৌদ্ধ প্রভাব বিস্তৃত হলে এখানে মূর্তি পুজো কমে যায়। পরে সেনযুগে আবার এর বাড়বাড়ন্ত হলে রণরঙ্গিনী নানা দেবী পূজিতা হন দস্যু তস্কর ও নিষ্ঠুর জমিদারদের দ্বারা। দেখতে দেখতে গড়ে উঠলো একচালা প্রতিমা। প্রতিমার গা ভর্তি সোনার গয়না ঝলমল করে উঠলো। দুর্গার কেশদামে গুঁজে দেয়া হলো ২৬টি স্বর্ণনির্মিত স্বর্ণচাঁপা। নাকে ৩০টি নথ। মাথায় সোনার মুকুট। তারপর তোপধ্বনির পর সন্ধিপূজোর শুরু। দৈনিক নৈবেদ্য দেওয়া হল ২৩ মণ চালের। সাহেব মেমরা ত বটেই, ওয়ারেন হেস্টিংস পর্যন্ত হাতীতে চড়ে এসেছিলেন সেই পূজায়। ক্লাইভ দক্ষিণা দিয়েছিলেন ১০১ টাকা। সাহেবসুবোরা মৌজ করে দেখলেন বাঈজী নাচ, এছাড়াও পানভোজন ও মনোরঞ্জনের নানা উপচার তো ছিলই। এই পুজোর বিপুল সাফল্য অনুপ্রেরণা জোগায় অন্যান্য ধনী ব্যবসায়ীদের, যাঁরা স্ব স্ব গৃহে ধুমধাম সহকারে চালু করে দেন দুর্গাপূজা। বাড়ির পুজোয় কোনও ইউরোপীয়ের, বিশেষ করে ব্রিটিশের উপস্থিতি, হয়ে ওঠে অর্থ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, এবং কোম্পানির সঙ্গে সান্নিধ্যের প্রতীক।
উইকিপিডিয়ার শেষ আপডেট অনুযায়ী, বিশ্বে বাঙালী মুসলমান হল ১৮৫ মিলিয়ন এবং বাঙালী হিন্দুর সংখ্যা হল ৮০ মিলিয়ন। তাহলে দুর্গা পূজা সর্বজনীন হয় কিভাবে? আর বাঙালীর সেরা উৎসবই বা হয় কিভাবে? এছাড়া বাংলার মুলনিবাসী ও আদিবাসীরা দুর্গা পুজাকে তাদের পরাজয়ের প্রতীক বলে মনে করে। যে দুর্গাকে অসুর হত্যার কারণে হিন্দু সম্প্রদায় পূজা করে সেই অসুরকেই নিজেদের রাজা বলে বাংলার মূলনিবাসী ও আদিবাসীরা পূজা করে এবং দুর্গাপুজাকে তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে। দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে তারা বুক চাপড়ে কাঁদে। এই হল দুর্গাপূজার ইতিহাস।
