গণবিপ্লব এবং একটি সংক্ষিপ্ত আদালত: প্রেক্ষাপট রুমানিয়া
২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৯: ছোট্ট একটি সামরিক আদালত বসে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে। সেখানে দু’দিন আগেকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাই চসেস্কু এবং তার স্ত্রী এলেনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
পূর্ব ইউরোপের তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রুমানিয়া, আয়তন ৮২ হাজার বর্গমাইল, লোক সংখ্যা ২ কোটি। ১৯৬৫ সাল থেকে দেশটি শাসন করছিলেন রুমানিয়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিকোলাস চসেস্কু (Nicolae Ceauşescu)। তিনি ছিলেন এক নিকৃষ্ট স্বৈরাচার, তার অত্যাচারের মাত্র এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, চসেস্কুর পচিশ বছরের শাসনে সিক্রেট পুলিশ বাহিনীর হাতে কয়েক লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। চসেস্কুর চেয়ে অত্যাচারে এক ডিগ্রি এগিয়ে ছিলেন তার স্ত্রী এলিয়েনা। চসেস্কুর লুটপাটের ফলে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে, খাদ্যের জন্য নাগরিকরা দোকানে লম্বা লাইনে থাকত, শীতের দেশ হওয়ার পরেও প্রজারা কোনো হিটার ব্যবহার করতে পারত না। জনগনের প্রতিবাদ বা কথা বলার কোনো অধিকার ছিলো না। সরকারী গোয়েন্দাদের উৎপাতে সভা-সমাবেশ করতে পারত না। বিরোধী শক্তিকে নির্মমভাবে দমন করা হতো, এমনকি হাজার হাজার গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটে।
১৯৮৯ সালের শেষ দিকে চসেস্কুর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে জনগন। ১৬ ডিসেম্বর বিপুল সংখ্যায় মানুষ রাজপথে নেমে আসে, আর তা দমন করতে পুলিশের পাশাপাশি সেনা ও ট্যাংক নামিয়ে দেয় চসেস্কু। ২০-২১ ডিসেম্বর দু’দিনেই প্রায় দু’হাজার মানুষ নিহত হয়। বুখারেস্টের রেড স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালিয়ে, তাদের হটিয়ে দিয়ে, কমিনিউস্ট পার্টির ক্যাডার নামিয়ে পাল্টা জনসভার আয়োজন করে সেখানে ভাষণ দেন চসেস্কু। বিশ্ববাসীকে তাই দেখানো হয়!
কিন্তু না, গল্প এখানে শেষ হয়নি। তখনও গোটা বিশ্ব বুঝতে পারেনি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। বর্হিবিশ্ব দূরের কথা, চসেস্কু নিজেও বাস্তব অবস্থা বুঝতে সক্ষম হননি। ২১ ডিসেম্বর লাখ লাখ লোক রাজপথ দখল করে নেয়। এ আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিলো টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার। গণআন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে অবস্থা বেগতিক দেখে সেনারাও কেউ কেউ জনতার সাথে হাত মেলায়। এমনকি চসেস্কুর ডিফেন্স মিনিস্টার পক্ষ ত্যাগ করে। মাত্র ১দিন আগে চসেস্কু যে লোকগুলিকে কামান বন্দুকের সাহায্য নিয়ে নিজের সমর্থনে নামিয়েছিলো, এক দিন পরে তারাই ভয়মুক্ত হয়ে চসেস্কুকে ধাওয়া করে। অবস্থা বেগতিক দেখে বুখারেস্টের রাজপ্রাসাদ থেকে হেলিকপ্টারে ঐদিনই পালিয়ে যায় চসেস্কু। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জঙ্গিবিমান কয়েক মিনিটের মধ্যেই হেলিকপ্টারটি ইন্টারসেপ্ট করে নামিয়ে আনে চসেস্কুকে। এনেই বসানো হয় তাৎক্ষণিক সেনা আদালত। সামারি ট্রায়ালের পরে চসেস্কু ও তার স্ত্রী এলিয়েনাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। সাথে সাথে সেনারা বেধে ফেলে চসেস্কু ও এলিয়েনাকে, এবং ভবনের পেছনে নিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। গণবিপ্লবের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয় রুমানিয়ায়।
– ফেইসবুক থেকে
