রাষ্ট্রীয় গুম হত্যার ইতিহাসে চ্যাঞ্চল্যকর বিচারের ঘটনা ঘটছে মেক্সিকোতে

গত ২৫ আগস্ট মেক্সিকোর এক বিচারক ২০১৪ সালে সংঘটিত ৪৩ জন ছাত্রের গুম ও হত্যার ঘটনা গোপন করা ও মিথ্যা তথ্যদানের অভিযোগে দেশটির সাবেক অ্যাটর্ণী জেনারেল হিসাস মুরিলো কারামকে আটকাদেশ দেয়, এবং পুরো বিচারকালে তাকে আটকই থাকতে হবে। কারাম এক সময়ের ক্ষমতাসীন পিআরআই দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিল। দেশের ফেডারেল জুডিসিয়ারি কাউন্সিলের শুনানীর পরে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেয়া হয়, ঐ ঘটনার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় এটর্ণী জেনারেল কারাম যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তা ছিল ‘হিস্টোরিকাল ট্রুথ’।

কারামের অপরাধ হচ্ছে, ২০১৪ সালে ৩৪জন শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রীয় ‘গুম’ করার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা এবং দায়িত্বে থাকাকালে এই বিষয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান। তার বিচার করা হবে গুম, নির্যাতন এবং বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করার অভিযোগে। ঐ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আরও ৮০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, কমপক্ষে ৫০ জন আটক হয়েছেন। এদের মধ্যে ঐ এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন সেনাবাহিনীর এমন তিনজন সাবেক শীর্ষ কমান্ডারও আটক হয়েছেন।

দেশের ট্রুথ কমিশন ২০১৪ সালে কলেজ ছাত্রদের গুম হবার ঘটনাটিকে ‘রাষ্ট্র সংঘটিত অপরাধ’ (স্টেট ক্রাইম) হিসাবে চিহ্নিত করেছে। ঘটনা সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে,
২৬ জুলাই ২০১৪ আয়োতজিনাপা গ্রামীণ শহরের একটি শিক্ষক কলেজ থেকে ৪৩ জন যুবক মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে ইগুয়ালা শহরে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাচ্ছিল। তৎকালীন সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ঐ শিক্ষার্থীরা হাঙ্গামা করতে যাচ্ছে এই সন্দেহে পথে পুলিশ তাঁদের আটক করে এবং মেক্সিকোর একটি ড্রাগ গ্যাং-এর হাতে তুলে দেয়। এই মাদক ব্যবসায়ীরা শিক্ষার্থীদের হত্যা করে, তাঁদের মৃতদেহ পুড়িয়ে সেগুলো নদীতে ফেলে দেয়। সেনাবাহিনী দাবী করেছিল যে, তাঁদের আটকের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিলো না। কিন্তু পরে জানা গেছে যে, ঐ তরুণদের আটকের পরে তাঁদের ভাগ করে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। এর মধ্যে কয়েক জনকে সেনাবাহিনীর স্থানীয় ঘাটিতেও নেয়া হয়। এদের কেউ কেউ বেশ কিছুদিন বেঁচেও ছিলেন। কথিত অপহরণকারী ও হত্যাকারীদের সাথে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। কিন্ত তা স্বত্বেও রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায় থেকে গুম, হত্যা, অস্বীকার এবং তা ধামাচাপা দেবার এই ঘটনাটি এখন অনেক বেশি আলোচিত।

২৫ আগস্ট মেক্সিকোর আদালতে যা ঘটেছে সেই রকম ঘটনা অহরহ ঘটেনা, তবে যা ঘটেছে, তার তাৎপর্য কেবল মেক্সিকোর জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সম্ভবত এর তাৎপর্য গোটা বিশ্বে ঘটা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গুম ও হত্যার জন্য একটি বড় মেসেজ। মেক্সিকোর এই বিচারিক ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এই ধরণের রাষ্ট্রীয় অপরাধ কখনো তামাদি হয়ে যায়না, উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা তা থেকে দায়মুক্তি পেতে পারেনা, এবং ন্যায় বিচারে যারা বাধা দেয় তাঁরাও অপরাধী বলেই বিবেচিত হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.