একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাকে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব বানানোর রাতভর চেষ্টা

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটির নির্বাচিত সদস্য এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা ও প্রতিবেশি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্বস্ত বিজন কান্তি সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহম্মদ ইউনুসের মুখ্যসচিব পদে নিয়োগ দানের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান অফিসে শুক্রবার দিবাগত গভীর রাত অবধি দফায় দফায় মিটিং চলে। পরিকল্পনা মোতাবেক রবিবার সকালে সচিবালয়ে শত শত বঞ্ছিত কর্মকর্তা যখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘেরাও করবে, ঐ ফাঁকে বিজন কান্তি সরকারের সারসংক্ষেপ জনপ্রশাসন সচিবকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। জানা গেছে, এইসকল পরিকল্পনার সাথে জড়িত আছেন চেয়ারপারসনের পিএস (অব. যুগ্মসচিব) আবদুস সাত্তার, আবদুল বারী (অব. যুগ্মসচিব), কামরুজ্জামান প্রমুখরা।
উল্লেখ্য গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে পদোন্নতি বঞ্ছিত অফিসারদের একটি ওপেন সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে রবিবার দিন সচিবালয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিগত সরকারের সচিবদের ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিতদের অপসারণ করে বঞ্ছিতদের পদোন্নতি দিয়ে ঐসকল পদে বসানোর জন্য সর্বোচ্চ চাপ দেয়া হবে। কিন্তু এই মিটিংয়ের পরে রাতভর গুলশানের কাশিম বাজার কুঠিতে চলে বিশেষ এক ব্যক্তিকে বসানোর তৎপরতা।
অন্তর্বতী সরকারের প্রথম সপ্তাহে বঞ্ছিত কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন সচিবের কাছে বার বার ধর্ণা দিতে থাকেন, চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন, যাতে করে অতিদ্রুত ১৬ বছর ধরে জমে থাকা বঞ্ছিতদেরকে দ্রুত তাদের প্রাপ্য পদোন্নতিগুলি দিয়ে বিগত আমলের সুবিধাভোগিদের সরিয়ে ঐসব পদে বসানো হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন সচিব হিসাবে বসে আছেন পতিত লীগ সরকারের প্রতিভূ সচিব মেজবাহ উদ্দিন, যিনি আওয়ামী বুদ্ধিজীবি সাবেক সচিব কামাল নাসের ভাগিনা। মেসবাহউদ্দিন ডিভাইড এন্ড রুলের মাধ্যমে বঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ এবং সার্ভিং গ্রুপের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে দিতে সমর্থ হন। বিএনপি চেয়ারপারসনের পিএস পদে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব আবদুস সাত্তারকে ভজিয়ে তিনি ৮২/৮৩ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্তদেরকে পদোন্নতি এবং সচিবালয়ে পদায়নের টোপ দেন। ফলে বঞ্চিতরা ভাগ হয়ে যায় অবসরপ্রাপ্ত এবং সার্ভিং দুই গ্রুপে। ১০-১৫ বছর আগে অবসরপ্রাপ্তরা সার্ভিস জুনিয়রদেরকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও সার্ভিংরা তা মানতে নারাজ। এক্ষত্রে কতগুলি বিষয় বিবেচনার দাবী রাখে:
এক) ১৯৮২/৮৩ ব্যাচের যে সকল কর্মকর্তারা ১০-১৫ বছর আগে অবসরে গেছেন বা যাদেরকে অবসরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের এখন বয়স ৭৫-৮০র মধ্যে। অনেকেই তারা আলঝাইমার ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। এ অবস্থায় তাঁরা সরাসরি সচিবের চেয়ার বসতে চাইছেন এত বছর পরে। এদেরকে মন্ত্রণালয়ের সচিবের চেয়ারে বসাবেন, নাকি বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্থা, কমিশন বা রাষ্ট্রদূত করবেন, তা বিবেচনার দাবি রাখে।
দুই) ১৯৮২ ব্যাচের প্রথম কর্মকর্তা শেখ আব্দুর রশিদকে সামনে রেখে পেছনে ৮২/৮৩ বিশেষ ব্যাচ বা ৮৪ ব্যাচের ৫০/৬০ জন অবঃরা লাইন দিয়েছেন-জুনিয়রদের হঠিয়ে সচিব হতে! সচিব পদে বসানোর এই কুতৎপরতায় সাংঘাতিকভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন বর্তমানে যারা সচিব হওয়ার কথা তারা। এত বয়স, চিন্তা, চেতনার ব্যবধানে সচিবালয়ের পরিবেশ অস্থির হওয়ার কথা। অনেকটা নানা-নাতির মত!
তিন) সরকারী চাকরি শেষে যারা রাজনৈতিক পদে কাজ করছেন অর্থাৎ এমনকি নির্বাচিত দলীয় পদ হোল্ড করছেন সেরকম ব্যক্তি যদি মুখ্য সচিব হতে চায়, তবে সেটা কতটা সুস্থ মাথার কাজ তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কেননা রাজনীতিতে চলে গেলে আর সরকারি চাকরিতে কেন সাংবিধানিক সংস্থাতেও ফেরা যায় না। ওনাদের জন্য কেবল বাকী থাকে এমপি মন্ত্রী হওয়া।
চার) PMRS নামে বিএনপি’র একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন আছে সেখানে যে সকল অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আছেন, তারা অলরেডি রাজনীতির ময়দানে দলীয় পতাকা নিয়ে নেমেছেন, তারাও সচিব হতে চান! কিন্তু কি করে এটা সম্ভব? এরপরে কি আর সচিবালয়কে সরকারি দপ্তর বলা যাবে, নাকি রাজনৈতিক সংগঠন?
পাঁচ) বর্তমানে যারা সচিব আছেন বিসিএস ১৩ ব্যাচের এবং এরপরে ১৫ ব্যাচের আসছে, এরা জয়েন করেছে ১৯৯৬ সালে; আর ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা জয়েন করেছেন ১৯৮২ সালে। বয়সের এত বিশাল ব্যবধানে কেউ কখনও চাকরি করেছে?
ছয়) ১৯৮২ বা তার আশেপাশের যে ব্যাচগুলির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আছেন, তারা বর্তমানে সচিবালয়ের সিস্টেম সম্পর্কে বিশেষ করে ই-নথি, ই-গভর্ণেন্স সম্পর্কে একেবারেই অজানা এবং তাদেরকে বসালে কি তারা আবার সাবেকী মডেলে ফিরে যাবেন?
সাত) বর্তমানে মাঠে যারা কর্মরত আছেন, তাদের সঙ্গে তাদের সমসাময়িক ব্যাচগুলির যেরকম যোগাযোগ বা সম্পর্ক, তার মধ্যে যদি ১৫/২০ বছরের সিনিয়রর ঢোকে, তবে মাঠ প্রশাসনে সাংঘাতিক গ্যাপ তৈরি হবে।
আট) বৃদ্ধ অবঃ অফিসারদের এই চুক্তিভিত্তিক প্রত্যাবর্তন কি কেবল সচিবালয়েই সুযোগ দেয়া হবে, নাকি অন্যান্য সার্ভিসে এবং ক্যাডারেও দেয়া হবে? এই বৈষম্য দূরীভূত হবে কি করে?
নয়) ইন্টার সার্ভিস রিলেশন তথা সামরিক বাহিনী পুলিশ বাহিনী অন্যান্য যে সকল ফোর্সেস আছে, তাদের প্রধানদের চেয়েও এই অবসরপ্রাপ্ত চুক্তিভিত্তিক সচিবরা অনেক সিনিয়র হবে, ফলে কার কথা কে শুনবে। ভেঙ্গে পড়বে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ব্যবস্থা।
দশ) বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অবসরের পরে সচিবের পদে বসানোর কোনো নজীর নাই। তো এই নজীরবিহীন তান্ডব করে কার উপকার হবে, নাকি অন্তর্বতী সরকারকে বিপদে ফেলতে এটি একটি স্যাবোটেজ মাত্র।
জুনিয়রদের দাবী, সার্ভিংদের প্রথমে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করা হোক, তারপরে সিনিয়র ব্যাচের রিটায়ার্ড অফিসারদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্থা, কমিশন, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, দূতাবাসে নিয়োগ করে প্রতিকার ও সম্মনিত করা যায়।
