সচিবালয়ে পরিবর্তনে কোনো গতি নেই, ধীরলয়ে প্রতিবিপ্লবের আশংকা বাড়ছে
সচিবালয় প্রতিনিধি

অন্তর্বতী সরকারের তিন সপ্তাহ পূর্ণ হলো, অথচ ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে পতিত স্বৈরাচারের সচিবরা এবং চুক্তিভিত্তিরা এখনও চেয়ার দখল করে আছে। এমনকি জুলাই বিপ্লবে ছাত্রজনতার ওপর সরাসরি গুলি চালানোর প্রকাশ্য পরামর্শদাতা জনপ্রশাসন সচিব মেজবাহউদ্দিন এখনও স্বপদে আসীন, এবং তাকে রাজীখুশি করিয়ে পদোন্নতি পদায়ন করতে হচ্ছে। আজকে ১৩১ জন অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি দেয়া হয়েছে, এর আগে যুগ্মসচিব ও উপসচিব প্রমোশন দেয়া হয়েছে। যার জন্য সময় লেগেছে তিন সপ্তাহ। বিগত সরকারের প্রভাবশালীরা পদ না ছাড়ায় অন্তর্বতী সরকারের সংস্কার এবং কর্মকর্তাদের পদায়নে সমস্যা হচ্ছে। ১৩১ অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতির পরে এখন অফিসারের ঘাটতি নেই, তাই বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ও জালিম সচিবদের ও চুক্তিভিত্তিকদের অবিলম্বে বাড়ি পাঠানোর দাবী উঠেছে।
পতিত সরকারের কয়েকজন ল্যাসপেন্সার সচিবদের বিবরণ:
১) হেনা মোরশেদ জামান, পতিত স্বৈরাচারের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব এখনও পদে আসীন। একে আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মুখ্য সচিব পদে নিয়োগের জন্য আকাশ প্রমান তদবীর ও গুজব ছড়ানো হয়। অথচ এই কর্মকর্তা টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। মোট তিনটি মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালনে করেন মোর্শেদ। ফলে নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূখ্যসচিব পদে তার নিয়োগের গুঞ্জন শুরু হওয়ার পর থেকে তাকে ঘিরে নানা আলোচনা হচ্ছে। মোরশেদের বাড়ি চট্টগ্রাম হওয়ায় কানাঘুসার পালে হাওয়া লাগে।
জানা গেছে, আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ১৯৯৬ এর জাতীয় নির্বাচনের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোরশেদ জামান। এর ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর সচিবের পিএস, ঢাকা জেলার এডিসি, নরসিংদী ও ফরিদপুরের জেলাপ্রশাসক, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের পরিচালক পদে কাজ করেছেন। অভিযোগ আছে, ওই সময়ে মোরশেদ জামান সরাসরি নিজের পদ ও পদবি ব্যবহার করে বিরোধী দলের লোকজনের ওপর নিপীড়নে কাজ করেছেন। অনেক দিন মতিঝিল আইডিয়েল স্কুল ও কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ছাত্রছাত্রী ভর্তি নিয়ে আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন- এমন অভিযোগ রয়েছে আবু হেনা মোরশেদ জামানের বিরুদ্ধে। ঢাকা শহরে তিনি একাধিক ফ্লাট ও প্লটের মালিক বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী এই আমলে মোরশেদ জামান প্রথমে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব , পরে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে সচিব, শেষে স্থানীয় সরকার বিভাগে নিয়োগ লাভ করেন। মোর্শেদকে অবিলম্বে বরখাস্ত করে কৃত অপরাধের জন্য বিচারের দাবী উঠেছে।
২) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান (৫৭০৪), তাকে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব পদায়ন করা হয়। অথচ তিনি আওয়ামী আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব। তিনি গাজিপুরের মেয়র জাহাংগীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু। তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার বিষয়ে জাহাংগীরের বেশ ভূমিকা ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির একটি ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। তিনি এবং তার পুরো পরিবার সরাসরি আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত।
৩) মোঃ আব্দুর রহমান খান (৭৭৬৮), ১৩তম বিসিএসের ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তা। পতিত হাসিনা সরকার তাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (ব্যাংকিং) সচিব বানিয়েছিল, যা নিয়ে অনেক গল্প আছে, বর্তমান সরকার তাকে অভ্যন্তরীন সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে পদায়ন করে। তাকে সচিব হিসেবে নিয়োগে সরাসরি ভূমিকায় ছিলেন আর্থিক সেক্টর ধ্বংসকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর আব্দুর রউফ। তিনি আব্দুর রউফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বেশী পরিচিত। ব্যাংকিং সেক্টরের দূর্নীতিবাজদের সাথে ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বংসে তার ভূমিকা রয়েছে। চরম দূর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তা এই আব্দুর রহমানের মূল প্রমোটার আসলে এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম। একথা সচিবালয়ে প্রচারিত আছে যে, ব্যাংকিং সচিব পদে আব্দুর রহমানকে বসাতে লীগ সরকারের হাইকমান্ডকে এস আলম ৫০ কোটি টাকা উৎকোচ প্রদান করে। পরবতীতে সুদ ও ট্যাক্স মওকুফ এবং ব্যাংক লুটপাটের মাধ্যমে বিনিয়োগের টাকা তুলে নিবে। এখন সেই বিনিয়োগ তুলতেই তাকে আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করার ধৃষ্ঠতা দেখায় এস আলম গ্রুপ। এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তার স্বার্থের ডিল এবং ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাটে জড়িত থাকার দায়ে আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করা উচিত।
