ডিসি নিয়োগ নিয়ে নজীরবিহীন তুলকালাম : সিনিয়র অফিসারদের হেনস্তার পরে চেককান্ড, চলছে তদন্ত

সচিবালয় প্রতিবেদক
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিজয়ের পরে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার দেড় মাসের মধ্যে দেশের ৫৯টি জেলায় জেলাপ্রশাসক পরিবর্তন করা হয়েছে। এই ডিসি নিয়োগ করতে উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাই করতে নানাবিধ পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্য হতে ডিসি পদে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হয়ে থাকে। এবারের বিসিএস ২৪, ২৫, ও ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তারা বিবেচনায় ছিল।

জেলাপ্রশাসকদের পদায়ন করার সাথে সাথেই বিগত আওয়ামী আমলে বঞ্ছিত কর্মকর্তাদের একটি গ্রুপের অভিযোগ, এই নিয়োগে বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদেরকেই বসানো হয়েছে। অসন্তোষ প্রতিবাদ থেকে বাদানুবাদ ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে থাকে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ডিসি পদায়ন প্রত্যাশী কিছু জুনিয়র অফিসাররা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় হৈ চৈ করে, চিৎকার ও শ্লোগান দেয়, তারা দু’জন যুগ্ম সচিবের কক্ষে ঢুকে নাজেহাল করে, এমনকি দায়িত্বরত গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাকে মারপিট করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, বিপুল পরিমান আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ত্যাগী, বঞ্চিত ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বাইরে রেখে আওয়ামী লীগ পরিবার সংশ্লিষ্ট এবং বিগত ১৫ বছরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদেরই আবার ডিসি পদে পুনর্বাসন করা হয়েছে। নবনিযুক্ত এসব জেলাপ্রশাসকদের নিয়োগ বাতিল চেয়ে ঢাকা, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, নাটোর জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৯জন ডিসির নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং ৪ জনের রদবদল করা হয়। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের এ ক্ষোভের বিষয়টি তদন্তে একজন সিনিয়র সচিবকে প্রধান করে পরদিনই একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার উত্তাপ কমাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠপ্রশাসনের সংশ্লিষ্ট যুগ্মসচিবকে সিলেটে বদলী করা হয়।

কিন্তু এই ঘটনার জের না কাটতেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের অন্য একজন যুগ্মসচিবের কক্ষ থেকে ডিসি পদায়ন সংক্রান্ত ঘুষ লেনদেনের ৩ কোটি টাকার চেক উদ্ধারের সংবাদ ছাপা হয় প্রতিবেশী দেশের অর্থে পরিচালিত একটি বিতর্কিত দৈনিক পত্রিকায়। এ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় নানা রংচং মেখে সংবাদ এবং ট্রল প্রকাশ করা হয়। এরপরেই সরকার নড়েচড়ে বসে। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। বেরিয়ে আসতে থাকে নানা কাহিনী- যা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ধরে নেয়ার কারণ রয়েছে। এর আগে গন্ডগোল করা অফিসারদের একজনকে ঢাকার বাইরে বদলী করা হয়। বিষয়টি নিয়ে চলছে তথ্য সংগ্রহ এবং চুলচেড়া বিশ্লেষন।

জানা গেছে, এই চেককান্ডের ঘটনাটি একটি সাজানো নাটক ছিল। যে কর্মকর্তার কক্ষ থেকে কথিত চেকটি উদ্ধার দাবী করা হয়েছে, তিনি ডিসি নিয়োগ প্রক্রিয়ার কেউ নন। তারপরও তাকে টার্গেট করে আক্রমন করা হয়েছে। সকল গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে। সেখানে তারা জানতে পেরেছেন, চেক উদ্ধারের কোনো ঘটনা এপিডি উইংয়ের কেউ দেখেওনি, জানেও না। কোনো কর্মকর্তার রুম থেকে আপত্তিকর কিছু উদ্ধার হলে বা সিজ করতে হলে কিছু নিয়ম বা প্রক্রিয়া আছে, সাক্ষীসাবুদও দরকার হয়। কিন্তু সেগুলো অনুসরণ করে দুদক, বা পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি। কেবল কথিত সাংবাদিকের কাছেই খবরটা ছিল। ঐ সাংবাদিকের কাছে বিস্তারিত জানার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চিঠি দিলে তিনি সহযোগিতা না করে উল্টো কয়েজন সমর্থককে নিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদী প্লাকার্ড দেখান, তার সাংবাদিকতার প্রতি হুমকি হিসাবে বলার চেষ্টা করেন। অথচ ঘটনা সত্য হলে তিনি তথ্য প্রমান দিয়ে সহযোগিতা করতে পারতেন।

অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যার একাউন্টের নামে ঐ চেক, সেই একাউন্টে ৩ কোটি টাকা তো দূরের কথা ৩ হাজার টাকাও নেই। তাছাড়া চেকটি ঐ যুগ্মসচিবের নামে ইস্যু করাও নয়, বাহক চেক মাত্র। যে ২/৩জন জেলাপ্রশাসকের পদায়নের নিমিত্ত ঐ চেক লেনদেন দাবী করা হয়েছে, তাদের কাছে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে জোরের সাথেই বলছেন, এরকম কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই।

সাধারণ বিবেক বুদ্ধি কি বলে? ৩ কোটি টাকা ঘুস কি কেউ চেকে নেয়, বা নিতে পারে? ঐ টাকা কি কেউ তুলতে পারবে? তাছাড়া ব্যাংকে তো টাকাই নেই। তাহলে কি দাড়ালো? জিনিসটা পুরোটাই একটি বানোয়াট নাটক, এবং হাতে বানানো ষড়যন্ত্র। একটি সুত্র জানায়, এই ষড়যন্ত্র করে সফল হলে এর পরের ধাপে জনপ্রশাসন সচিবকে একটি কায়দায় ফাঁসিয়ে উৎখাত করার পরিকল্পনা ছিল।

তবে সরকারের তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের কল লিস্ট থেকে দেখতে পেয়েছেন, এক ভয়াবহ চিত্র। ঐ সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের সাথে আন্দোলনকারী উপসচিব পর্যায়ের এক কর্মকর্তার (তার ব্যাকগ্রাউন্ডও সাংবাদিকতা) অংসংখ্য ফোন কল রয়েছে, যা থেকে অনেককিছুই অনুমান করা যায়। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি তার প্রটেকশনের জন্য এখন বড় একটি রাজনৈতিক দলের বড় বড় মাথাকে ব্যবহার করছেন। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, দলটি কি এজাতীয় ষড়যন্ত্রের সাথে জড়াবে?

শোনা যাচ্ছে, ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কড়া পদক্ষেপ আসছে।



Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.