ঢাকা এলাকার বিরোধী মতামতের লোকজনকে লাশ বানিয়ে ডাম্পিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসপি শাহ মিজান শাফিউর রহমান

বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা ঢাকা জেলার এসপি শাহ মিজান শাফিউর রহমান। প্রথম দৃষ্টিতে নম্র ও শান্ত স্বভাবের মনে হলেও বাস্তবে তিনি অত্যন্ত গোঁয়ার ও নিষ্ঠুর টাইপের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের অত্যন্ত সক্রিয় ক্যাডার। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের গোপন কিলিং গুলোর মাস্টার প্লানিং তিনিই করতেন বলে জনশ্রুতি আছে।

ভেড়ার চামড়ায় নেকড়ে হয়ে শাফিউর বিএনপির সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রো এলাকায় জোনাল এসির দায়িত্ব পান এবং নিজেকে বিএনপি-পন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মেয়র নির্বাচিত করা ও পরবর্তীতে তৎকালীন মেয়র মীর নাসির এর সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে স্থানীয় পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হন তিনি।

লক্ষ্মীপুর জেলায় এসপি থাকাকালে তিনি বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীকে হত্যা, গুম ও পংগু করে দেন। গুম ও খুনের উদ্দেশ্যে এসময় তিনি ডিবি’র কিছু বিশ্বস্ত পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে একটি টিম তৈরি করেন। কেবল বিএনপি ও জামাতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই তিনি খড়গহস্ত ছিলেন, তা নয়, তিনি বাকশাল মতবাদের বিরুদ্ধচারী সকল শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে অসংখ্য ভুয়া মামলা তৈরি করে ব্যাপক অত্যাচার করেন।

লক্ষীপুরে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির সাথে বেয়াদবি ও অসংগত আচরণ করার ঘটনায় পত্রপত্রিকায় সমালোচনার ঢেউ ওঠে। শাহ মিজানের উদ্ভট ও দাম্ভিক আচরণের কারণে সরকার তাকে লক্ষীপুর থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়।

ডিআইজি হাসানুল হায়দারের ভাবশিষ্য এই পুলিশ কর্মকর্তা লক্ষ্মীপুর জেলায় বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের দলনের পুরস্কার হিসাবে ঢাকা জেলার এসপি হিসাবে পোস্টিং পান।

ঢাকা জেলায় যোগদানের পর তিনি নিজে থেকে লাশ ডাম্পিং এর দায়িত্ব নেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিরোধী মতামতের লোকজনকে তুলে এনে শাহ মিজানের দায়িত্বে দেওয়া হয়। শাহ মিজান তার টিমকে দিয়ে সেসব লাশ প্রত্যন্ত বিল, নদী, খাল ও ব্রীজের ধারে ডাম্পিং এর ন্যায় বিশ্বস্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। জানা যায়, মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশের লোমহর্ষক খুনের ঘটনায় লাশগুলো তার দায়িত্বে ডাম্পিং করা হয়েছে। সারা বছর পত্রিকার পাতায় ঢাকা জেলার বিভিন্ন স্থানে যে বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায় এটি এসপি শাফিউরের কৃতিত্ব। চারিত্রিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় ও ভয়ংকর হওয়ায় তিনি এই বিশেষ কাজটি দক্ষতার সাথে করে প্রায় তিন বছর ধরে এই জেলায় এসপি হিসাবে আছেন।

পুলিশ বাহিনীতে দলীয় ক্যাডারদের রিক্রুট করার মিশনে শাহ মিজানের অবদান সবার মুখে মুখে। এই একই কাজে এসপি হাবিবুর রহমানের (বর্তমানে ডিআইজি প্রশাসন) ফেলে আসা সকল রেকর্ড শাহ মিজান ইতিমধ্যেই ব্রেক করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি বাকশালের মতো চরম পন্থায় দীক্ষা লাভ করেন। সরকারী চাকুরী করেও তিনি প্রকাশ্যে বাকশালের মতো অগণতান্ত্রিক ও নিপীড়নমূলক চিন্তা-চেতনার পক্ষে কথা বলেন। তার ফেসবুক পেজে বাকশাল মতবাদের স্বপক্ষে নিজের অবস্থান সংক্রান্তে বেশ কয়েকটি স্ট্যাটাস আছে। শাহ মিজানের বড় ভাই নাটোরে এ বছর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের এমপি পদপ্রার্থী।

মানুষের জীবন নিয়ে কোন সরকার এভাবে ছিনিমিনি খেলেনি!

গুম হওয়া এক বিএনপি নেতা ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে হাসপাতালে আসলেন যেভাবে – সাক্ষাৎকার!

গত  ৩০শে সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশ থেকে ফেরার সময় রাত ৮টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের সামনে থেকে ডিবি পরিচয়ে এক সাথে তুলে নিয়ে যায় ৪জনকে। তার মধ্যে একজনের বাড়ি নোয়াখালীতে। তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা  (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হলো না)। দেখা হয় পিজি হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বেডে।  আমি নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে গিয়েছিলাম হাসপাতালে, ইমার্জেন্সী ওয়ার্ডের বেডে চোখ পড়তেই দেখি এক লোক কাতরাচ্ছে সমস্ত শরীরে আঘাতের চিহ্ন! এদিক সেদিক তাকিয়ে লোকটির পাশে দাঁড়ালাম, জিজ্ঞেস করলাম এমনটা হল কি করে? তিনি খুব কষ্টে ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন এক লোমহর্ষক কাহিনী, যা শুনে শরীরের লোম শিউরে ওঠে। আমি জিজ্ঞেস করলাম বলল কিভাবে হাসপাতালে এলো।

জানতে চাইলাম পুরো ঘটনা। বললেন পূরো কাহিনী, যা এখানে লিখলে হয়তো তার পরিচয় ওরা জেনে যাবে এবং আবার তুলে নিয়ে যাবে। তাই সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরলাম,

ঘটনার বর্ণনা : ঐ রাতে গ্রেফতার করে কোনো পুলিশ থানায় নিয়ে যায়নি, কোন এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে রাতেই বেধড়ক পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলেছিল, তারপর পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে জ্ঞান ফেরানোর পর পরদিন সারাদিন একটা গাড়িতে রাখে। রাতে তার লোকাল এমপির কাছে ফোন করে কথা বলে আবার পিডায়, আবার অজ্ঞান হয়ে গেলে সে অবস্থায় আবার নিয়ে যায় অজানা কোনো স্থানে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাটিতে ফেলার পর তার জ্ঞান ফিরলে ঘাতক দল বলে, তোর এলাকার এমপি বলেছেন তোকে ওপারে পাঠাতে। দোয়া কলমা পড়ে নে। ঠিক সে সময় একটা ফোন আসলো, একজন অফিসার কথা বলা শেষে বললো- যা বেঁচে গেলি! এখানে থাক্। তখন ঐ অফিসারের পা জড়িয়ে ধরে বলে- স্যার, আমাকে হয় মেরে ফেলুন, নাহয় হাসপাতালে নিয়ে যান। এখানে এভাবে ফেলে গিয়ে যন্ত্রণা দিয়ে মারবেন না। আল্লাহর রহমতে ঐ অফিসারের দয়া হল, নিয়ে আসলো পিজি’তে। ইমার্জেন্সিতে ফেলে ওরা চলে গেল। কথা গুলো বলার সময় কাঁদছিলেন, আর বলছিলেন। আজ এখন এখানে আমার দ্বিতীয় জীবনের শুরু। ডিবি নামের এ লোক গুলো এত হিংস্র জঘন্য! আল্লাহর রহমত ছিল বলে বেঁচে আছি। এরপর সংগে থাকা বাকি ৩ জনের কথা জিজ্ঞেস করলে বললেন ওদের পরিনতি তিনি জানেন না । 

গত ২দিন আগে আবার তার সাথে কথা বলে জানলাম নিরাপত্তার স্বার্থে একদিন পরেই পিজি থেকে চলে যান প্রাইভেট হাসপাতালে। সেখানে কয়েক দিন থেকেই টাকার অভাবে চিকিৎসা শেষ না করেই বাসায় ফিরেন। ডাক্তার বলেছেন প্রতিদিন থেরাপি দিতে হবে। বা হাত অনেকটা অকেজো, প্রচন্ড ব্যাথা শরীরে। কিন্তু টাকার জন্য থেরাপিও নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার মত একজন নেতা আজ টাকার জন্য চিকিৎসা নিতে পারছি না, দলের সাধারণ কর্মীদের কি অবস্থা? আমি আজ প্রায় ২১ দিন দ্বিতীয় বার জীবন পেয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে আল্লাহর দয়ায় ফিরলাম দলের হাইকমান্ডের কোনো নেতা খবর নিলো না। দলে নির্যাতিত নেতা কর্মীদের দেখভাল করার জন্য কোন টিম নাই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলে উঠলেন , ভাই দয়া করে আপনি দূ’কলম লিখেন যেন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেন। এভাবে একটা দল চলতে পারেনা,  দলের নেতা কর্মীরা একসময় দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। আমি দীর্ঘ ২০ বছর রাজনীতি করে আজ আমার পাশে কাউকে পাচ্ছি না। আমার নিজেরই এখন দলের একজন নেতা পরিচয় দিতে ঘৃণা হচ্ছে নিজের প্রতি।

আমি সব শুনে তাকে বল্লাম ভাই আমার লেখা তো তারেক রহমান পর্যন্ত পৌঁছাবে না  তবু ও লিখব। হ্যাঁ লিখলাম । আমি আমার কথা রাখলাম। এবার নেতাদের কানে পৌঁছে দিতে পারেন অনলাইন ইউজাররা এ লেখা কপি শেয়ার করে ।

/vob24-7

‘আন্দোলন দমনের পর গ্রেপ্তার চলছে বাংলাদেশে’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে গুরুতর আহত হওয়া ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার বক্তব্য, সে দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার ইচ্ছা সোচ্চার হওয়ার। তবে তার ভয় কেবল বাছবিচারহীন গ্রেপ্তার নিয়েই নয়; তার আশঙ্কা হামলাকারীরা ফের এসে তাকে স্তব্ধ করে দিয়ে যাবে। এই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘আমাদেরকে ভাবতে দিন যে আমরা একা নই। এসব মাত্রাতিরিক্ত হচ্ছে।’
প্রকৃতপক্ষেই, এসব মাত্রাতিরিক্ত।
গত মাসের শেষের দিকে চলন্ত বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী সম্প্রতি রাজপথে নামে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল অধিকতর নিরাপদ সড়ক। পাশাপাশি, সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিতের দাবি ছিল তাদের। প্রতিবাদের শ্লোগানই ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ তারা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাজপথ কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে দেয়। ১.৮ কোটি বাসিন্দার শহরকে স্তবির করে দেয়।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায় সরকার। টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা বেশ কয়েকদিন ধরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে ছবি ও ভিডিও পাঠাচ্ছেন। সেখানে শাসক দল আওয়ামী লীগের সমর্থক পরিচয়ধারী অনেককে ইউনিফর্ম পরিহিত স্কুল শিশুসহ প্রতিবাদকারীদের পেটাতে দেখা যাচ্ছে।
১৮ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী জানায়, ৩রা আগস্ট যখন সে ছবি তুলছিল, তখন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য পরিচয়ধারী একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়। তার ভাষ্য, ‘তারা আমার ক্যামেরা চাচ্ছিল।’ তাকে যখন লাঠি, পাইপ ও ছাপাতি দিয়ে মারা হচ্ছিল, তখন পুলিশ নিরবে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। তার ভাষ্য, ‘তারা (পুলিশ) কিছুই করেনি।’
এই হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার বদলে বাংলাদেশ সরকার সমালোচনা বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুজনের অ্যাকাউন্ট মনিটর করছে। সহিংস দমনপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলায় অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয়েছে, এদের মধ্যে আছেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল আলম।
এসবের অবসান হওয়া জরুরী। বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ শহীদুল আলম ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দেয়া। সরকার সমর্থকরাসহ যারাই সহিংসতা ঘটিয়েছে তাদের সকলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া। শিশুসহ প্রত্যেকের প্রতিবাদ করার অধিকার সমুন্নত রাখা। কারণ, অল্পবয়সী শিক্ষার্থীরা তো না-ই, কারোই সোচ্চার হওয়ার কারণে গ্রেপ্তার বা সহিংসতার ভয়ে থাকা উচিৎ নয়।

আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার : মানুষের ইজ্জত এবং সম্পদের পাহারাদার!

দিনভর আন্দোলনরত একটি ছাত্রীকে পিছন থেকে তার ওড়না দিয়ে চোখ-মুখ বেধে উঠিয়ে নিয়ে যায় একটি মুখোশ পরা হায়েনা। গন্ধটা চেনা চেনা লাগলেও মুখে কাপড় পেঁচানো থাকায় কোন কথা বলতে পারছিলোনা রুহী। অবশেষে সে নিজেকে আবিস্কার করলো একটি পুলিশ ভ্যানে। আরো কয়েকজন ছাত্রী হাত-পাঁ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে গাড়ির মেঝেতে।

গাড়িটা চলতে শুরু করলো।

মাথায় হেলমেট পড়া কয়েকটা পুলিশ আর মুখে কাপড় পরা কয়েকটা ছেলে তাদের দেহ নিয়ে খেলা করছে। রুহীর বাবাও একজন পুলিশ, এই মূহুর্তে বাবাকে খুব মনে পড়ছে তার। বাবা কাছে থাকলে হয়তো এই জানোয়ারগুলা এমন করার সাহস পেতনা। রুহীর ভাই এলাকার ছাত্রলীগের সভাপতি। এই সময় তার ভাইকে ভীষণ প্রয়োজন রুহীর। এর আগে অনেকবার ধর্ষকদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে তাকে। রুহীর চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা বইতে লাগলো। এটাই কি তাহলে ছাত্রী জীবনের শেষ পরিণতি।

হঠাৎ একটা চেনা কণ্ঠে রুহী চমকে উঠলো।

ঐ মাগীরা..! আন্দোলন করস, আন্দোলন আজ তোদের…..মধ্যে হান্দাই দিমু। আজ আমরাই তোগোর লগে আন্দোলন করুম…..। কণ্ঠটা চির-চেনা রুহীর। নাহ, পশুটা অন্য কেউ নয়, তার সেই বড় ভাই- যে কি না শতবার তার ইজ্জত বাঁচিয়েছে। বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে টুকরো হওয়ার অবস্থা রুহীর। শুধু মুখে কাপড় গুজা থাকায় চিৎকার করতে পারছিলোনা সে।

গাড়ির চাকা থেমে গেলো-

রুহীকে কাঁধে উঠিয়ে নিলো হেলমেট পরা এক পুলিশ জানোয়ার। জানোয়ার গুলোর সে কি… হাসি আর উল্লাস। কিন্তু পুলিশটার হাতের স্পর্শ পরিচিত মনে হলো রুহীর।তৎক্ষণাৎ একটি ভাঙ্গা দালানের মেঝেতে নিজেকে দেখতে পেলো সে। তার দিকে তেড়ে আসছে চেনা কণ্ঠের মুখোশ পড়া সেই ছেলেটা। কিন্তু নাহ, শুধু কণ্ঠটাই চেনা নয়। ছেলেটাও তার চেনা। সে তার বড় ভাই রিমন! ঘৃণায় আর দুঃখে মরে যেতে ইচ্ছে করছে রুহীর।

ততক্ষণে মুখের কাপড় খুলে ফেলেছে সে।

ছেলেটা কাছে আসতেই গগণফাটা চিৎকার দিয়েরুহী বলতে লাগলো ভাইয়া..! আমি রুহী। বলেই ডুকরে ডুকরে কান্না শুরু করলো।সাথে সাথেই থমকে দাড়ালো পৃথিবী। রুহীর দিকে তাকাতেই মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেললো পুলিশ অফিসার।মুখ থেকে কাপড় সরালো ছেলেটা।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় বাবা ছেলের দিকে চেয়ে আছে ছেলে বাবার দিকে। বাবা তুমি..?  রিমন তুই..? এমন বিব্রতকর অবস্থায় তাদের মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়লো।  মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো মেঝেতে। ছিঃ তারা কিনা নিজের মেয়ে আর বোনকে ধর্ষণ করতেই এখানে উন্মাদের মতো ছুটে এসেছে। তারা কি করবে ভেবে না পেয়ে দুজনে রুহীর পায়ে পরে গেলো।

মা, আমরা অনেক বড় ভুল করেছি,  এতো বড় পাপ মনে হয় পৃথিবীর বুকে আমরাই প্রথম করলাম। তুই আমাদের ক্ষমা করে দে।  রুহী চিৎকার করে পিছনে সরে গেলো। খবরদার..! খবরদার..! তোমরা আমাকে স্পর্শ করবেনা। তোমরা আমার কেউনা। কোন জানোয়ার আমার বাবা হতে পারেনা। আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার, মানুষের ইজ্জত এবং সম্পদের পাহাড়াদার।

তোমার মতো জানোয়ার পুলিশ আমার বাবা না

আজ আমার জায়গায় যদি অন্যকেউ হতো নিশ্চয় তোমরা তাকে ছেড়ে দিতেনা। কিন্তু সেই মেয়েটাও তো কোন না কোন বাবা-মায়ের সন্তান।ভাইয়া..! জানো তোমাকে নিয়ে আমি কত্ত গর্ব করতাম। কিন্তু আমার বান্ধবীরা বলতো ছাত্রলীগ মানেই পশু, ছাত্রলীগ মানেই জানোয়ার। আমি ওদের কথার প্রতিবাদ করতাম। আজ নিজ চোখে দেখলাম তোমরা জানোয়ারের চেয়ে অধম। এসো, তোমাদের লালসা মেটাও। অপরাধী প্রতিটি পুলিশ ও ছাত্রলীগ অপরাধ করছে নিজ পরিবারের সাথে। ধর্ষন করছে নিজের সন্তান, বোনকে। প্রমানকর তোমরা আর কত নিচে নামতে পারো ওদের জন্য।

 

(সংগৃহীত : এক পুলিশ অফিসারের সন্তানের লেখা )

বরিশালে পুলিশ কমিশনারের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পেটালেন লীগের টোকাই নেতা মুরাদ!

বরিশালে আ’লীগ দলীয় প্রার্থী সাদেক আব্দুল্লাহর পক্ষে প্রচারণায় এসে ঘটনাচক্রে পুলিশ কমিশনারের ওপর চড়াও হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ নেতা শাহে আলম মুরাদ। একটি যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে এই নেতা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার মর্যাদার এক কর্মকর্তাসহ তিন পুলিশ সদস্যকে পেটালেন। এ সময় পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মাহফুজুর রহমানকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। শনিবার সন্ধ্যারাতে বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালের এই ঘটনায় বরিশাল পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় চলছে। ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের এসআই নিজাম মাহমুদ ফকির বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১ জনের নাম উল্লেখ করে ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

টক অব দ্য কান্ট্রি হওয়া ওই ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার সন্ধ্যারাতে বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালে নোঙরকারী সুন্দরবন-১১ লঞ্চের ভিআইপি কেবিনে। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ লঞ্চের ভিআইপি কেবিনের সামনে অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী নিয়ে অবস্থান করছিলেন।
সেখানে গিয়ে দেখতে পান অর্ধশতাধিক লোকের মধ্যে বসেছিলেন আ’লীগ নেতা শাহ আলম মুরাদ। এই নেতার সাথে থাকা অপরাপর বেশ কয়েক ব্যক্তি পিস্তল হাতে নিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করছিলেন। সেই দৃশ্য দেখে কমিশনারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি জানতে চান এবং পিস্তলের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য কাগজপত্র চান।
প্রায় একই সময় ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মেদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান লঞ্চঘাটে যান। সরকারি এই কর্মকর্তাকে প্রটোকল দিতে সেখানে গিয়েছিলেন ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম ও পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মাহফুজুর রহমান। কিন্তু ঘটনাচক্রে সচিবকে পেছনে ফেলে পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা চলে যান লঞ্চের ভিআইপি কেবিনের লাউঞ্জে। সেখানে গিয়ে দেখতে পান অর্ধশতাধিক লোকের মধ্যে বসেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম মুরাদ। এই নেতার সঙ্গে থাকা অপরাপর বেশ কয়েক ব্যক্তি পিস্তল হাতে নিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করছিলেন। সেই দৃশ্য দেখে কমিশনারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম ছুটে গিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি জানতে চান এবং পিস্তলের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা শাহে আলম মুরাদ ও তার সঙ্গে থাকা লোকজন পুলিশের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়ান।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ কমিশনারের দেহরক্ষী ছুটে গিয়ে তাদের দ্রুত স্থান ত্যাগের অনুরোধ করেন। এই সময়ে তুমুল বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে থাকা সৈকত ইমরানসহ ২০ থেকে ২৫ জন একত্রিত হয়ে সহকারী জাহিদুল ইসলাম ও দেহরক্ষী হাসিবকে এলোপাতাড়ি পিটুনি দেয়।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ কমিশনার চেয়েছিলেন সকলকে বের করে দিয়ে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার। কিন্তু ক্ষুব্ধ শাহে আলম ও তার লোকজন পুলিশ কমিশনারকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে শাহে আলম কমিশনারের মাথায় পিস্তল ধরেন।

এমনকি কমিশনারকে এই সময়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন তার সঙ্গে থাকা ইমরান সৈকতসহ বেশ কয়েকজন। এই চিত্র ক্যামেরায় ধারণ করতে গেলে কমিশনারের সঙ্গী ওবায়েদকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তার সঙ্গে থাকা ক্যামেরাটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় শাহে আলমের লোকজন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ কমিশনার দ্রুত ফোন করে ঘটনাস্থলে আরো পুলিশ ডেকে নেন। কিন্তু বরিশাল পুলিশ চাইছিল না সরকারের দুইজন সচিবের উপস্থিতিতে এই ধরনের বিষয় প্রকাশ্যে আসুক।

যে কারণে ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নিতে লঞ্চটি থামিয়ে রাখা হলেও পরবর্তীতে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে একটি সূত্র দাবি করছে- এই ঘটনার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিক শাহে আলম মুরাদ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতাকে মুঠোফোনে অবহিত করেন। এর পরেই কমিশনারের মোবাইল ফোনে কোন ব্যক্তিবিশেষ ফোন করে কথা বলেন। মূলত মুঠোফোনে আলাপচারিতার পরই বরিশাল পুলিশ গ্রেপ্তারের মতো কোনো ঘটনার দিকে না গিয়ে লঞ্চটি ছেড়ে দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা লঞ্চের যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এই লঞ্চে ঢাকার যাত্রা নিরাপদ নয় মনে করে টার্মিনালেই নেমে যান। যদিও লঞ্চটি ছেড়ে দেওয়ার আগেই পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান পুরো ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র সিসিটিভি থেকে সংগ্রহ করে রাখেন বলে শোনা গেছে।

এই বিষয়টি নিয়ে রোববার দিনভর বরিশাল পুলিশে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইলেও দায়িত্বশীল কোন কর্মকর্তা মুখ খোলেন নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট কোতয়ালি থানা পুলিশও বিষয়টি স্বীকার করছে না। তবে গভীর রাতে পুলিশের একটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে- এই ঘটনায় শাহ আলম মুরাদের নাম উল্লেখ না করে সৈকত ইমরানের নাম উল্লেখ করে ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নাম্বার ৩৩/১৮। তারিখ ১৫ জুলাই। মামলায় তাদের ১৪২/১৪৩/১৮৬/৩৫৩/৩৩২/৩৩৩/৩০৭ ও ৩৪ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার অনুঘটক শাহ আলম মুরাদকে কেন নামধারী আসামি করা হচ্ছে না সেই সম্পর্কে বরিশাল পুলিশের পক্ষ থেকে কোন মন্তব্য আসেনি। তাছাড়া অভিযুক্তদের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের পাওয়া যায়নি। ঘটনার বিষয়ে শাহে আলম মুরাদ মানবজমিনকে বলেন, ঘটনায় আমি জড়িত নই। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাদা পোশাকের পুলিশের বাক-বিতণ্ডা হয়েছিল। যা পরে মিটমাট হয়ে গেছে।

তবে এই ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা এক আ’লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন- পুলিশ কমিশনার শাহ আলম মুরাদকে সঙ্গীদের নিয়ে বসে থাকতে দেখতে পান। ওই সময় তাকে দেখে কেন আ’লীগ নেতারা উঠে দাড়ালেন না এই বিষয়টিতে তিনি ক্ষুব্ধ হন। মূলত এই কারণেই তর্কাতর্কির একপর্যায়ে এই উদ্বুদ্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাহফুজুর রহমান বলেছেন, ঢাকা থেকে আসা কতিপয় বাজে ছেলেপান তাদের সদস্যদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। এই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে সচিবালয় সূত্র জানায়, বরিশাল সিটি নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং প্লান ঠিক করতে মাঠে গিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সচিব সাজ্জাদুল হাসান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মেদ। তাদেরকে প্রটোকল দিতে গিয়া ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান ঢাকা মহানগরী দক্ষিনের আ’লীগ সেক্রেটারী শাহে আলম মুরাদের বাহিনীর হাতে মারপিটের শিকার হন। মুরাদ ঢাকা দক্ষিনের টোকাই থেকে উঠতি মস্তান নেতা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি বৈঠার ঘটনায় তার হাতে নিহত হয় জামায়াতের কর্মীরা। তারপর গত দশ বছরে ফুলে ফেপে বড় হয় এই টোকাই মুরাদ, হাজার কোটি টাকার মালিক। আর এবারে সোজা পুলিশ কমিশনারের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পিটুনি। দুই সচিব, পুলিশ কমিশনার এবং শাহে আলম মুরাদ সবাই গিয়েছিল আ’লীগ প্রার্থীর জন্য কাজ করতে। কিন্তু সালাম না দেয়া এবং চেয়ার ছেড়ে না উঠার কারনে ঘটে যায় সেমসাইড এটাক।
তবে দুই সচিবের এই দলবাজি এবং ভোটকাটার মিশনে সেমসাইড এটাকে  পুলিশের বড় কর্তারা ধোলাই খাওয়া পুলিশ বাহিনী স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। তবে এই দুই সচিব চেষ্টা করেছিলেন ঘটনাটা ধামাচাপা দিতে, কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে তা দেশজুড়ে চাউর হয়! এরপর থেকে দুই সচিবের কীর্তি এবং পুলিশের মার খাওয়া নিয়ে সচিবালয়ে মুখোরোচক আলোচনা। চারিদিকে ছি ছি পড়ে গেছে!

 

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী হেলাল রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত!

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী পুলিশের সার্জেন্ট হেলাল রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। রবিবার রাতে ফেনীর রামপুরে এ ঘটনায় ঘটে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রবিবার নিজে গাড়ি চালিয়ে চট্টগ্রামের কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে অন্যত্র থেকে আসা একটি গাড়ি তার গাড়িকে লক্ষ্য করে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তার গাড়ি উল্টে যায়। এ সময় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে মারা যান তিনি।
জানা যায়, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী হওয়ার পর থেকেই সার্জেন্ট হেলাল ও তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে নিযার্তন করা হচ্ছিল। তাকে হত্যার হুমকিও আসতো বিভিন্ন সময়।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা। ফেনী জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর মীর গোলাম ফারুক জানান, হেলাল উদ্দিন ভুঁইয়া তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা থেকে রবিবার নিজে প্রাইভেট কার (চট্ট-মেট্রো-গ-১১-৫১৪১) চালিয়ে চট্টগ্রামে কর্মস্থলের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। রামপুর এলাকায় পৌঁছার পর তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে ছিটকে গিয়ে আরো একটি গাছের সাথে ধাক্কা লাগে। এতে প্রাইভেট কারের সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে।

পরিবার জানায়, এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যা হতে পারে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে তার পরিবার।

 

বাংলাদেশ পুলিশের ১৯৯৫ ব্যাচের সার্জেন্ট হেলাল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের সময় চট্টগ্রামের বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন।

/ইত্তেফাক

এক অডিও ক্লিপেই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ রহস্য ফাঁস: গার্ডিয়ান প্রতিবেদন

বাংলাদেশের চলমান বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যার ব্যাপারে সরগরম হয়ে উঠছে একের পর এক দেশী বিদেশী মিডিয়া। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো বৃটিশ জনপ্রিয় পত্রিকা গার্ডিয়ান। কক্সবাজারের পৌর কাউন্সিলর একরামকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার একটি অডিও রিপোর্ট নিয়ে তারা গতকাল ৬ জুন একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। “Audio clip ‘captures Bangladeshi police killing drugs suspect’ Death of Akramul Haque raises fresh fears over extrajudicial killings in drugs crackdown” শিরোনামের এই রিপোর্টে বলা হয় সম্প্রতি একটি টেলিফোনিক কথোপকথোন ফাঁস হয়েছে যা বাংলাদেশ সরকারের চলমান মাদক বিরোধী অভিযানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কক্সবাজারের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক গত ২৭মে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বলে জানায় র‌্যাব। বাংলাদেশের এই এলিট ফোর্সটি একরামকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করে এবং তার কাছ থেকে দুটি অস্ত্র এবং কয়েক হাজার পিস ইয়াবাও উদ্ধার করা হয়েছে।

এই ঘটনার ৪ দিন পর নিহত একরামের স্ত্রী আয়েশা কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার দিন রাতে তার স্বামীর সাথে মোবাইল কথোপকথোনের মোট ৪টি ক্লিপ ফাঁস করেন যাতে বোঝা যায় বাস্তব ঘটনা র‌্যাবের ইতোপূর্বের দাবীর তুলনায় পুরোপুরি আলাদা।

প্রথম তিনটি ক্লিপে নিহত একরাম তার মেয়েকে জানান, তাকে একটু জরুরী কাজে স্থানীয় এক সরকারী কর্মকর্তার কাছে যেতে হচ্ছে। ‘আমি গাড়িতে আছি, এখন বেশী কথা বলতে পারবোনা।’ এটাই ছিল মেয়েকে বাবার শেষ কথা।

শেষ কলটি একরামকে দিয়েছিলেন আয়েশা নিজেই। কিন্তু এবার কিছু লোকজনের এলোমেলো কথাই কেবল শোনা যায়। এর মধ্যে একরামের কন্ঠ একবার শোনা যায়, তিনি বলছিলেন, ‘আমি এগুলোর সাথে জড়িত নই।’ এর পরপরই গুলির শব্দ। তারপর একটা মানুষের গোঙ্গানি, এরপর আবার একটা গুলি। আয়েশা আর তার মেয়েরা গুলির শব্দ শুনেই ফোনের অপর প্রান্তে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দেন।

আয়েশা ও তার মেয়েরা যখন ফোনে চিৎকার করছিল তখন অপরপ্রান্তে তারা পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পাচ্ছিলো। একজন বলে উঠে, বুলেটগুলো নিয়ে নাও। আরেকজন প্রশ্ন করে লাশের হাত দুটোকে কি বাঁধা হয়েছে?

আয়েশা সংবাদ সম্মেলনে এই ক্লিপটি সাংবাদিকদেরকে শোনান এবং দাবী করেন তার স্বামীকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। আয়েশার এই সংবাদ সম্মেলন এবং অডিও ক্লিপটি পরের দিন বাংলাদেশের প্রধানতম ইংরেজী জাতীয় দৈনিক ডেইলী স্টারের প্রথম পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়। এর পর থেকে ১৮ ঘন্টা এই পত্রিকাটির অনলাইন ওয়েবসাইটটা বন্ধ করে রাখে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।

এরপরই আবার এই মাদক বিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। মাত্র ৩ সপ্তাহে এই অভিযানে এই পর্যন্ত ১৩১ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ অবশ্য এইসব হত্যাকেই বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দাবী করে এবং নিহতের কাছে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলেও জানায়।

তবে বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য একেএম ওয়াহিদুজ্জামান অভিযোগ করেন কথিত এই মাদক বিরোধী অভিযানে এই পর্যন্ত তাদের দলের ১৫ জন নেতাকর্মীকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এত বড় অভিযানে দুই একটা ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেশটির মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রেজাউল হক অবশ্য এই সকল হত্যাকান্ডের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন সকল কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার তদন্ত দাবী করেছে।

এই বিষয়ে র‌্যাবের মতামত জানার জন্য বেশ কয়েকবার তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আমারে মারবেন ক্যান, স্যার?

রবিউল রক্তশূন্য মুখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন? রবিউল যখন প্রশ্নটা করল তখন আমি সিগারেটে সর্বশেষ টান দিচ্ছি। প্রশ্ন শুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য থামলাম। তারপর আবার লম্বা করে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে উপর দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে আগুন নেভালাম। রবিউলের জবাব না দিয়েই বললাম, ফারুক! ওর চোখ বাঁধো।

রবিউল নামের মধ্যবয়সী লোকটা এবার চূড়ান্ত ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। তার কপাল থেকে নিয়ে থুতনি পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কাঁপছে। ফারুক চোখ বাঁধার কাপড় খুঁজতে গাড়িতে চলে গেল। আমি বিরক্ত হলাম। গাড়ি থেকে নামার সময়েই জিনিষটা পকেটে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। ভালো ছিল গাড়িতেই চোখ বেঁধে রেখে দিতে পারলে। এসব কাজে দেরি করার কোনো মানে নেই। ঝামেলা যত দ্রুত সরানো যায় ততই মঙ্গল।

“স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন?”- রবিউল দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রশ্ন করলে আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, এত কথা কেন রে বাপ? উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই পেয়ে যাবা। এখন আল্লাহ খোদার নাম নাও।

রবিউল এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল সে মারা যাচ্ছে। এক মুহুর্ত নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে তারপর অদ্ভূত এক কাজ করে ফেলল লোকটা। হাতে হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় ঝপ করে কাঁটা ফলের মতো আমার পায়ের নিচে পড়ে হাউমাউ করে বলল, স্যার আমারে মাইরেন না। আমি নির্দোষ স্যার! ও স্যার গো! আপনার দোহাই গো!

কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা ঈশ্বরের পরে যদি কেউ জানে তবে সেটা র‍্যাব-পুলিশ। এই লোকটা যে আপাতমস্তক ভালো মানুষ, সেই খবর তার স্ত্রীর অজানা থাকলেও আমাদের অজানা নয়। ভালো মানুষদের নাকি আয়ু কম থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যুগে যুগে ভালো মানুষদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। কে পরাঘাতে মরে নি? সক্রেটিস? কোপার্নিকাস? বান্না? এমনকি যিশু খ্রিষ্টকেও এভাবেই মরতে হয়েছে। যুগের নিয়মই এমন। সভ্যতার রীতি এটাই। আমি নিয়ম পাল্টানোর কেউ নই!
রবিউলকে টেনে হিঁচড়ে মাটি থেকে তোলা হলো। তার গায়ে এই বিস্তীর্ণ মাঠের কিছু ধুলো লেগে গেল। লোকটার কাঁপুনি ক্রমশই বাড়ছে। আমার জানামতে আগামীকাল জোছনা। এই পরিষ্কার আকাশে আজকের রাতটাকেই জোছনা রাত বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোয় রবিউলের চোখের কিনার ঘেষে নেমে পড়া অশ্রুর ধারা চিকচিক করছে। বিরাট আকাশের নিচে রাতের এই নির্জনতায় রবিউলকে মনে হচ্ছে সামান্য কীট পতঙ্গ, যার জন্ম হচ্ছে কেবলই মৃত্যুর জন্য!

রবিউল আরেকবার ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। এবার পেছন থেকে দুইজন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পড়তে না পারলেও সে খানিকটা চিৎকার করে সেই একই কথা বলল, ‘স্যার আমারে মাইরেন না স্যার। আমি নির্দোষ স্যার। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। তাদের দেখার কেউ নাই স্যার। আমার বউ খুব অসুস্থ স্যার।’

আমি উল্টো ঘুরে পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। চারপাশে বাতাস, লাইটারে আগুন ধরাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কাজটাতে নতুন না আমি, তারপরও প্রতিবারই একটু হলে অস্বস্তি লাগে। সিগারেট তখন খুব কাজে দেয়। নিকোটিন রক্ত থেকে অনেকটাই উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। যদিও এখানে উদ্বেগের মতো কিছুই নেই। লোকটা আহামরি কেউ না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। সরকারদলীয় এক নেতার টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় নেতার ছেলেকে ধর্ষণ চেষ্টারত অবস্থায় ধরে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করিয়েছে। তারপর নেতার পুত্রকে গ্রেফতারের জন্য করেছে থানা অবরোধ। লোকটার ভালো পজিশনে বেশ কিছু জমি আছে। নেতা ভদ্রলোক সেই জমি হজম করতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাস্তব আইনে মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দায় রবিউল জমা করে রেখেছে!

দুই মিনিট হয়ে গেছে। ফারুক আসতে এত দেরি করছে কেন? গুলি করেই কাজ শেষ না। আরো যন্ত্রযোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত না চালিয়ে কাজ করলে কীভাবে হয়?

রবিউল ঘুরে ফিরে একই আর্তনাদ করেই যাচ্ছে। মুখ বেঁধে রাখলে ভালো হতো। সেটার অবশ্য খুব বেশি দরকার নেই। এই চিৎকার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কানে পৌঁছাবে না, অবশ্য সৃষ্টিকর্তা যদি শুনতে ইচ্ছুক হোন তবেই। রবিউলের ভেতরেও বোধহয় একই বোধ জাগল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো!

ডাকুক, বেশি করে ডাকুক। এসব বোকা মানুষগুলো ভাবে জগতে ঈশ্বরের একটাই সত্ত্বা। অথচ জগত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বরে বিভক্ত। এই যে রবিউল নামের এই লোকটাকে আমি একটু পরে মারতে যাচ্ছি সেটা নিজের ইচ্ছায় নয়, আমাকে একজন ঈশ্বর আদেশ করেছেন। সেই ঈশ্বরকে আদেশ করেছেন হয়তো আরেকজন, আরেকজনকে আরেকজন, সেই আরেকজনকে অন্য আরেকজন। রবিউল নামের এই সামান্য কাপড় ব্যবসায়ীর ধারণাই নেই তাকে মারার জন্য কত নীরব আয়োজন ঘটে গেছে–কত বছর, কত যুগ আর শতাব্দি ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। অথচ সে কেবল আমার দিকেই ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে যেখানে আমার অপরাধটাই সর্বনিম্ন।

ফারুক কাপড় নিয়ে এসেছে। গাড়ির কাছে গিয়েই তার পেচ্ছাব চেপেছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে একটু দেরি হয়েছে। এই পেচ্ছাব স্বাভাবিক না, শরীরে এঙজাইটি বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে। ফারুকের মতো কালো কাপড়ের মানুষও যদি এঙজাইটিক হয়ে যায়, রবিউল নামের মানুষটার ভেতরে এখন কি হচ্ছে কে জানে!

ফারুক চোখ বেঁধে নিল। সর্বশেষ বারের মতো রবিউলের চোখের দিকে তাকালাম আমি। জোছনার আলোয় রবিউলের চোখ গড়িয়ে এখনো পানি পড়ছে। তার সাথে সমস্ত জগতের রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় এবং ঘৃণা।

রবিউলের সময় শেষ হয়ে এসেছে। শেষবারের মতোও সে চিৎকার করে বলল, ‘স্যার আমার দুইটা বাচ্চা মেয়ে আছে স্যার। ওরা আজকে কাঁঠাল খাইতে চাইছিল। বছরের প্রথম কাঁঠাল বাজারে উঠছে। ওরা কাঁঠালের আশায় সারা রাত বসে থাকবে স্যার। স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। আমার বউ অসুস্থ স্যার। তার ডায়বেটিস, প্রেশার। তারে ডাক্তারের কাছে নেয়ার কেউ নাই।’

আমি এসব কানে দিলাম না। অভ্যস্ত হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলাম। যেহেতু ব্যাপারটাকে ‘বন্দুক যুদ্ধ’ হিসেবে চালানো হবে সুতরাং বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ভালো হতো। এতসব যন্ত্রণায় যাওয়ার দরকার নেই। এটা ইউরোপ আমেরিকা না যে গুলি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এটা বাংলাদেশ। এখানে একটা লাশের পেছনে এত সময় দেয়ার কিছু নেই। কেউ খুঁজতেই আসবে না।

আমি ট্রিগার টানলাম। “খট” করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনেই রবিউল একেবারে চুপ হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসের অনেক দেয়াল থাকে। সম্ভবত তার সর্বশেষ দেয়াল এখন ভাঙল। একটু আগেও হয়তো সে ভেবেছে কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে যাবে। তার দুই বাচ্চাকে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াবে। পিস্তল টানার শব্দে সে বিশ্বাস টুঁটে গেছে। তাকে কালিমা পড়তে বলা উচিত। আমি বললাম না। একবার একজনকে বলেছিলাম। অর্ধ উন্মাদ লোকটা আমার মুখে থু থু দিয়ে বলেছিল “তোর কালিমা তুই পড়। তুইও মরবি একদিন!”

আসলেই কথাটা চমৎকার। সবারই তো মরতে হবে। হত্যা খুব বড় কোনো অপরাধ না। এটা পূর্বনির্ধারিত একটা বস্তু। আজকে আমি এই ক্রসফায়ার না করলে অন্য কেউ করত। আমাদের চারপাশের যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বর, তাদের কাজ কখনো আটকায় না। বরং যারা আটকায়, তাদেরকেই আটকিয়ে দেয়া হয়।

রবিউল বিড়বিড় করে বলল, স্যার আমারে ক্যান মারবেন?—এই প্রথমবারের মতো আমি কোনো প্রশ্নের উত্তরে বললাম, জন্মের অপরাধে। জন্মের অপরাধে সকলকেই মরতে হয়। তাছাড়া তুমি ঈশ্বরের দেশে বাস করো- ঈশ্বরবিরোধী কর্মকান্ড করেছো। ঈশ্বরের বিচারে তোমার শাস্তি হচ্ছে। এবার আসমানের ঈশ্বরের কাছে যাও। পরের বিচারটুকু তাঁর কাছে গিয়েই দিয়ো। তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন তবে হয়তো এতদিন সব বিচার করবেন।

আমার এত জটিল কথা নেয়ার মতো অবস্থায় রবিউল যে নেই, সেটা আমিও জানি। তার ঠোঁট কাঁপছে। আমি স্থির হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বাঁধার কারণে রবিউল এই দৃশ্য দেখছে না, দেখলে গা মোচড়ামুচড়ি করত। মৃত্যুর প্রতি মানুষের সীমাহীন ভয়, জীবনের প্রতি সীমাহীন আশা। শেষ মুহুর্তেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। কেনো করে- কে জানে!

তিন ফুট দূর থেকে আমি রবিউলের বাম বুক তাক করলাম। আমার দলের বাকি তিন সদস্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছি ঠিক এই মুহুর্তে রবিউল বলল, স্যার গো…..

আমি থেমে গেলাম।

রবিউল বলল, স্যারগো! আপনারও মেয়ে আছে গো স্যার!

আমার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এটা এই লোকের জানার কথা না। লোকটা নিশ্চয়ই আন্দাজে বলে ফেলেছে। তবে আন্দাজ কিছুটা কাজ করেছে বলেই সে বাড়তি তিন সেকেন্ড সময় পেয়ে গেল। জীবনের শেষ সময়ে তিন সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা দামী সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

আমি রবিউলের বুকে পরপর তিনটি গুলি করলাম।

:

মানুষের মধ্যে হাজার রকম তফাৎ। ধর্মে, বর্ণে, নামে, চেহারায়, কর্মে সব মানুষই আলাদা। মৃত্যু সব মানুষকেই এক করে ফেলে। গুলি করার পর সবার শরীর থেকে রক্ত বের হয়, কাঁটা ফলের মতো পড়ে যায়। সবাই শেষের দিকে এসে অপার্থিব গোঙানি দেয়। এখানে কোনো তফাৎ সৃষ্টি হয়না।

রবিউল মিনিট দুয়েক “মা গো” “পানি পানি” এবং “নাসিমা-ফাহিমা” বলে গোঙাচ্ছিল। একটু আগে সেটা স্থির হয়ে গেছে। নাসিমা-ফাহিমা বোধহয় তার দুই মেয়ের নাম। দুই মেয়ের জন্য আগামীকাল দিনটা ভীষণ যন্ত্রণায় যাবে। ৮ বছর আর ৬ বছরের দুই বাচ্চা হুট করেই আবিষ্কার করবে তাদের বাবা নেই। তাদের বাবা ছিল মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি পুলিশে আর মানুষে ভরে যাবে। দুইটা বাচ্চা হতবিহ্বল হয়ে তাদের মায়ের মুর্ছা যাওয়া দেখবে। আগামীকাল কবর খোড়া থেকে নিয়ে অশান্তি আর অনিশ্চিত প্রস্তুতির যে জীবন শুরু হবে সেটা আর কোনো দিন থামবে না।

প্রস্তুতি আমাদেরও নিতে হবে। লাশের পাশে কয়েকটা গুলির খোসা, কয়েশ পিস ইয়াবা রেখে দিতে হবে। একটা ভাঙাচোরা বন্দুক আছে, সেটা সেট করতে হবে জায়গামতো। লাশের পকেটে মোবাইল ফোনে কিছু রেকর্ড হলো কিনা দেখা দরকার। দূর থেকে কেউ ভিডিও টিডিও করে ফেললে সাময়িক সমস্যায় পড়ে যাব। একটু ঘুরে সেটাও নিশ্চিত করা উচিত। এদেশের মানুষের কল্পনাশক্তি নিম্নশ্রেণীর জীবের চেয়েও কম। এদের চোখের আড়ালে এক লাখ ক্রসফায়ার করলেও মস্তিষ্ক সেসব দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না। অথচ কোনো ভিডিওতে কারো চড় মারা দেখলেই মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে। আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তেমন কিছু হবে না। কিছুদিন আলোচনা হবে। এক সময় দলে দলে ভাগ হবে আলোচনাকারীরা। সামনে আসবে নতুন কোনো আলোড়ন। সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। তারপরও খুব যদি কিছু হয় তবে দেশে ঈশ্বরেরা আছেন। বাকিটুকু তারাই দেখবেন। তারপরও অডিও, ভিডিও থেকে সাবধান থাকা ভালো। সবকিছু শেষ হলে একটা মুখস্ত প্রেস ব্রিফিং দিতে হবে। সেখানে সবকিছু আগে থেকেই টাইপ করা আছে, শুধু এডিট করে রবিউলের নাম আর বয়স বসিয়ে দিলেই হয়।

আর দুই ঘন্টার মামলা। তারপর আমি নিশ্চিন্ত। শুধু আজকের জন্য না, আগামী অনেক দিনের জন্য। আসমানের ঈশ্বরই যে তার কাজে পুরষ্কৃত করেন তা না, মাটির ঈশ্বরেরাও তাদের কাজ করে দিলে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পুরষ্কার আছে। আসমানের ঈশ্বরের মতো এখানে সময়ক্ষেপণ নেই। এই পুরষ্কার হাতে আসবে খুব দ্রুত।

:
:

আমার স্ত্রী মিলি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, চা খাবে?

আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, দিতে পারো।

মিলি কিচেনের দিকে চলে গেল। আমি পত্রিকা ঘাটাঘাটি করছি। পঞ্চম পৃষ্ঠার সপ্তম কলামে গিয়ে কাঙ্খিত খবরটা খুঁজে গেলাম। “র‍্যাবের ক্রসফায়ারে মাদক ব্যবসায়ী নিহত!”

“গতকাল রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নিহত রবিউল ডেমরা এলাকার আব্দুল মালিকের পুত্র। র‍্যাব জানায় গোপন খবরের ভিত্তিতে রবিউলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে বের হয় র‍্যাব। পথিমধ্যে রবিউলের সহযোগীরা র‍্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। র‍্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পালানোর সময় রবিউল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। র‍্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক, দুই রাউন্ড গুলি এবং চার’শ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে!”

খবর পড়ে বরাবরের মতোই আমার হাসি পেল। রবিউলকে ধরা থেকে নিয়ে গুলি করা এবং লাশ মর্গে পাঠানো পর্যন্ত আমাদের ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ১১ ঘন্টা। সাংবাদিকরা এত আয়োজন করে করা একটা ঘটনাকে পঞ্চম পাতার সাত নাম্বার কলামে দেড় ইঞ্চির মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তিলটা গুলি করতে আমার যতটা সময় লেগেছে এই খবর পড়তে লেগেছে তারচেয়েও কম। জীবনের দাম এখন কারো কাছেই বেশি না। না খুনীর কাছে, না সাংবাদিকের কাছে, না রাজার কাছে, না জনগণের কাছে। এককভাবে এই হত্যার দায় আমি কীভাবে নিই?

মিলি চা নিয়ে এসেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন সাপের মতো। আমাদের বিয়ের ৮ বছর হয়ে গেছে। মিলির শরীরে এই আট বছরে কয়েক কেজি মেদ জমেছে। কিন্তু শরীরটা এখনো সেই আগের মতোই আবেদনময়ী। শাড়ির ফাঁক গলে পেটের মধ্যে যে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে সেটা এতটুকু দৃষ্টিকটু নয়।

– মিলি পাশে এসে বসতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
– মিলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, এত আহ্লাদ করার দরকার নাই।
– আমি মিলির শরীরে চাপ দিয়ে বললাম, তাহলে কি করতে হবে?
– সংসারের খবর রাখতে হবে। বউয়ের খবর রাখতে হবে। প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরলে বউ অন্য পুরুষ ঘরে ঢোকাবে কিনা, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

– আর?

– আর বাচ্চাটার খবর রাখা দরকার। ৫ বছরের একটা বাচ্চা, বাবা বাবা বলে ঘুমিয়ে পড়ে। তার জন্য না একটা খেলনা এরোপ্লেন আনার কথা, সেটা কই?

শান্তা দুইদিন আগে এরোপ্লেনের আবদার করেছিল। রবিউলের ব্যস্ততায় সেটা মনেই করতে পারিনি। আহারে, আমার মেয়েটা হয়তো এরোপ্লেনের কথা ভেবে ঘুমাতে পারেনি। এক মুহুর্তের জন্য রবিউলের দুইটা মেয়ের কথা মাথায় আসল। কি যেন নাম? নাসিমা- ফাহিমা। ওরা বাবার কাছে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য আবদার করেছিল। বাচ্চা দুইটা কী এ জীবনে আর কোনোদিন কাঁঠাল মুখে দিতে পারবে? অবশ্য তাদের জীবনে ঘোর অন্ধকারের এখনো অনেক বাকি। তাদের জমি দখল হবে, ব্যবসা হাতছাড়া হবে। এক সময় বানের পানির কচুরিপানার মতোই তাদেরকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগবে। জীবন কতটা নিষ্ঠুর কতটা অন্ধকার তার পূর্ণ শিক্ষা এরা খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।

মিলি বলল, কি ভাবছ?

আমি বললাম, কিছু না।

– কিছু তো অবশ্যই। আজকাল তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলো না। কোথায় যে কি করে বেড়াচ্ছ কে জানে! মেয়ে টেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠলে কিন্তু খবর আছে। স্রেফ খুন করব। খুন করে বিধবা হয়ে যাব।

আমি আরেকবারের জন্য রবিউলের বিধবা স্ত্রীর কথা ভাবলাম। মেয়েটার বয়স কত হবে? হয়তো মিলির বয়সীই হবে, কিংবা আরো কম। এই মেয়েটা আজীবন একা থাকবে, কত দীর্ঘ রজনী পার করতে হবে একা একা। মেয়েটার শরীর থেকে মিলির মতোই গন্ধ বেরুবে, সেই গন্ধে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে পতঙ্গ। দুইটা বাচ্চা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে সে নিজে দিশেহারা হয়ে যাবে। এক সময় হয়তো ভুলেই যাবে শরীর কী, মন কী, জীবন কী? রবিউল মাত্র তিনটা গুলিতে উদ্ধার পেয়ে গেছে। এই মেয়ে সারা জীবন বুলেটবিদ্ধ হবে। রবিউলের মতো আর্তনাদ করার অধিকারটুকু সে পাবে না।

মিলি ভীষণ আদুরে গলায় বলল, এ্যাই…

– আমি বললাম, বলো।

– চলো না, একবার ঘুরে আসি।

– কোথায়?

– অজানাতে…

– সেটা কী?

– যেখানে নদী এসে মিশে গেছে। হাহাহা।

– হেয়ালী করছ?

– হ্যাঁ করছি। সত্যিই ঘুরে আসি। কতদিন ঘুরি না।

– কোথায় যাবে বলবে তো।

– গ্রান্ড সুলতানে যাব। শ্রীমঙ্গল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝখানে তুমি আর আমি। সুন্দর হবে না?

– হ্যাঁ হবে।

– কবে যাবে?

– আগামী সপ্তাহে।

মিলি চিৎকার করে বলল, ও মা সত্যিই?

আমি বললাম, হ্যাঁ সত্যিই। রেডি হও।

মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বলল, আমার দাবী মানার জন্য তুমি আমার কাছে পাওনাদার হয়ে গেলে। আজকে তোমার যাবতীয় ঋণ শোধ করা হবে।
তার ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি। এই হাসির অর্থ আমি জানি। এটা তার বিখ্যাত নিষিদ্ধ হাসি, এটা তার বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাসি। আমি তাকে তরল গলায় কিছু বলতে যাব তখনি শান্তা ঘরে ঢুকে বলল, আব্বু!

আমি বললাম, জ্বী মা!

– আমার হেলিকপ্টার কই?

– আছে। কালকেই পেয়ে যাবা।

– তুমি আজকে আননি কেন? আজকে যদি হেলিকপ্টারওয়ালা মারা যায়?

– মারা যাবে না। আর মারা গেলেও আমি ঠিকই নিয়ে আসব কালকে।

– মারা গেলে তখন কীভাবে পাবে? লোকটার তো কবর হয়ে যাবে।

আমি ঘড়ির দিতে তাকালাম। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হিসেব মতে আজকে রবিউলের লাশ তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ আয়োজনের পর এতক্ষণে সম্ভবত তার কবর হয়ে গেছে। সে এখন আসল ঈশ্বরের মুখোমুখি। আসল ঈশ্বর কী তাকে তার প্রাপ্য পুরষ্কারটুকু দেবেন?

আমার ঈশ্বর অবশ্য আমার প্রাপ্যটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংক একাউন্ট আরেকটু ভারী হয়ে গেছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে হবে গ্রান্ড সুলতান ট্রিপ। সেখান থেকে ফিরব, ঈশ্বর থেকে চলে আসবে নতুন কোনো নির্দেশনা।

আসল আর স্থানীয় ঈশ্বরদের মধ্যে পার্থক্যটা চমৎকার। আসল ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, আর স্থানীয় ঈশ্বরদেরকে সৃষ্টি করি আমরাই। আসল ঈশ্বরের মতোই স্থানীয় ঈশ্বরদের নিজস্ব ভক্ত থাকে, ধর্ম থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আসল ঈশ্বর আজন্ম আরাধনা করেও ভক্ত ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বরকে বদলাতে পারে না। তবে এখানে ঈশ্বর বদল আছে, চরম ভক্ত থেকে ছোটখাটো ঈশ্বরে পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে। দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বড় বেশি একরোখা। নিজেদের তৈরি আইনে তারা “বিরোধ” পছন্দ করেন না।

আমি এত কঠিন চিন্তা করছি কেন? ইদানিং কি মাথায় বেশি চাপ পড়ছে? চাপ কমানোর জন্য তাড়াতাড়ি ট্যুরটা করে ফেলতে হবে।

শান্তা দৌঁড়ে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। আমি তার কপালে লম্বা করে চুমু দিলাম। বাচ্চাটা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আমি অনুভব করলাম সেই চিরন্তন বাণী “পৃথিবীতে খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই।”

ঠিক তখুনি আমার কানে রবিউলের চিৎকার চলে আসল। “স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে।”

রবিউল বড় বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তো! এভাবে আগে কেউ দেয়নি।

:

:

আমরা শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি।

মিলি বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে বের হলে ড্রাইভার নেয়া পছন্দ করে না। তার মতে এতে প্রাইভেসী নষ্ট হয়। সময়টুকু নিজেদের থাকে না। মিলির কারণেই তখন আমাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হয়।

আমি ড্রাইভার হিসেবে যথেষ্ট সাবধানী। এখন পর্যন্ত ছোটখোটো কোনো দুর্ঘটনাও ঘটাইনি। তারপরও স্ত্রী সন্তান সাথে থাকলে সামান্য চাপ অনুভব করি। এত দূরের পথে ড্রাইভারকে আনলেই বোধহয় ভালো ছিল।

আমরা ভৈরব ব্রীজ পার হয়ে গেলাম। ব্রীজের পাশ ঘেষে রেলসেতু। শান্তা মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া হয় খুবই কম। এখন থেকে একটু অভ্যেস করিয়ে নিতে হবে। মেয়ের বয়সের তুলনায় ততটা বুদ্ধি হচ্ছে না। এই বয়সের বাবা মায়ের সঙ্গ তার অনেক বেশি দরকার।

গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে, “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে গান।” মিলি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে একই গতিতে। বহুদিন পর ড্রাইভ করে আমিও আরাম পাচ্ছি।

আমরা হবিগঞ্জে ঢুকে পড়লাম। আর কিছুদূর গেলেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ চোখে পড়বে। তারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মিলি আর শান্তা আগে কখনো এদিকে আসেনি। তারা ঠিক কতটা যে খুশি হবে ভেবেই আমি আনন্দ পাচ্ছি। তবে আমার আনন্দে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে গেল।

সামনে বড় রকমের জ্যাম। এই রাস্তায় জ্যাম হওয়ার কথা না। আমি গাড়ি থেকে মাথা বের করে একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সামনে একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ট্রাক আটকে সাময়িক একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরেই সেটা খুলে যাবে।

গাড়ি থেকে চাইলে বের হওয়া যায়। এই মুহুর্তে বের হতে ইচ্ছে করল না। আশেপাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো জায়গা নেই। বরং গাড়ি থামিয়ে স্ত্রী কন্যার সাথে একটু গল্প করা যায়।

আমাদের গাড়ির দুইপাশে আরো দুইটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সবার চোখে মুখে বিরক্তি। ট্রাক এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেছে কিনা এ খবর কেউ নিচ্ছে না। সবারই মনোযোগ কখন জ্যাম ছাড়বে তার প্রতি। আমি পেছন ঘুরে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা মণি কেমন আছো?

শান্তা বলল, ভালো আছি আব্বু। আর কতদূর?

আমি বললাম, এই তো চলে এসেছি। আর সামান্য দূর। তারপরেই পৌঁছে যাব।

শান্তা বলল, আমরা সেখানে গিয়ে অনেক মজা করব তাই না?

আমি বললাম, হ্যাঁ। অনেক মজা হবে।

মিলি আমাকে বলল, তুমি একটু হেঁটে গিয়ে দেখো না কি সমস্যা। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়।

– একটু সময় বসলে খুব বেশি ক্ষতি নেই। অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষা এক ধরণের পরীক্ষা।

মিলি চুপ হয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম। রবিউলকে ক্রসফায়ার দেয়ার সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। সবকিছু পুরোপুরি শান্ত। আমার ক্রসফায়ার নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি অবশ্য। কারোরই সমস্যা হয়না। সমস্যা করে বসে কিছু অতি উৎসাহীরা। এরা ফটো তুলে, ভিক্টিমের আর্তনাদ ভিডিও করে মজা নেয়ার জন্য। কোনো না কোনো ভাবে এরা এক সময় ফেঁসে যায়। আমি এসব করিনা, আমার সমস্যাও নেই। তারপরও প্রতিবারই সামান্য খচখচানি কাজ করে কিছুদিন। আমার মনে রবিউল ইস্যু চিরতরে ভুলে যাবার সময় চলে এসেছে।

বেলা দুইটা বিশ বাজে।

জ্যাম লাগার বিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। এখনো খোলার নাম নেই। একবার গাড়ি থেকে বের হয়ে খবর নেয়া উচিত। এই ভাবনা যখন এসেছে তখুনি একটা বিদঘুটে “ঝন ঝন ঝন” শব্দ আমার কানে আসল। ট্রেনের সিগন্যালের শব্দ! এর মানে ট্রেন আসছে। আমি এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম আমাদের গাড়ি ট্রেন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জিনিষটা আগে কেনো লক্ষ্য করিনি?

আমি গাড়ির দরজা খুলতে গেলাম। পাশের গাড়ির আমার গাড়ির সাথে চেপে আছে। দরজা খোলা সম্ভব না। দুইপাশের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাইরে চলে গেছে। আমি দরজা খুলতে পারছি না। মুখ বের করে চিৎকার করলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একটু দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে মুখে ভীতি।

গাড়ি সরানোর কোনো উপায় নাই। সামনে পেছনে গাড়ি। আমার গাড়ি সরাসরি লাইনের উপর। পাশের দুই গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি রেখে উধাও। কানের মধ্যে অনবরত “ঝনঝনঝন” আওয়াজ বেজেই চলেছে। আমি রক্তশূন্য মুখে মিলির দিকে তাকালাম। মিলি সমান আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সহজ একটা ফাঁদে আমরা আটকা পড়ে গেছি।

সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হলো আমার কাছে। প্রকৃতি এত অস্বাভাবিক আয়োজন করে রেখেছিল আমার জন্য? দুইপাশে দুইটা গাড়ি কখন এসে থামল ব্যাপারটা মাথাতেই নিইনি। এভাবে গাড়ি ট্রেনের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেও মনে কোনো ভয় জাগেনি। অথচ এক মুহুর্তের ব্যবধানে প্রতিটা পশমে মৃত্যু ভয় চলে এসেছে।

আমি পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সজোরে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিলাম। কিছুই হলো না।

ট্রেন খুব কাছ থেকে হুইসেল দিল। মিলি শান্তাকে জড়িয়ে ধরে “ও আল্লাহ, ও আল্লাহ” করছে। এক পর্যায়ে সেও পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগল এবং চিৎকার করে বলল “আমাদের বাঁচান। কে আছেন, বাঁচান প্লিজ।”

ট্রেনের শব্দ সরাসরি কানে আসছে। আমার হাতে আর কয়েক মুহুর্ত। আমি গ্লাসে সজোরে ঘুষি বসালাম। কোন কাজ হলো না। একটা পর্যায়ে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিল আমি নিজেই আজকে রবিউল। মৃত্যুকে সামনে রেখে অযথাই আর্তনাদ করে যাচ্ছি। আমার ভীত আত্মা কল্পনা করল আমার সামনে রবিউল দাঁড়িয়ে আছে আর আমি তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছি। এক সময় সত্যি সত্যিই আমি চিৎকার করে বললাম, আমারে ক্ষমা করে দেন ভাই। আমার স্ত্রী কন্যা মারা যাবে। তারা দোষ করেনি। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ…..

মৃত্যু মুহুর্তে যে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে সেটা আমি বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্ক বলছে রবিউলের স্ত্রী কন্যাও দোষ করেনি। তারাও শাস্তি পাচ্ছে। একই নিয়মে হয়তো আমার স্ত্রী কন্যাও মারা যাবে। এতদিন পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে সেগুলোকে ক্রসফায়ার বলেছি। এবার জীবনে সত্যিকারের ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হচ্ছি আমি। ঐ যে বিশাল ট্রেন এটাই হচ্ছে বুলেট। কোনো অদৃশ্য বিরাট শক্তি সমস্ত আয়োজন করে বুলেট ছুড়েছে। আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে জান্তব গুলি।

মিলি পাগলের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। শান্তা মিলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে আমার চোখ ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া চোখে ট্রেনটা চোখে পড়ল।

আর কয়েক সেকেন্ড!

আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় ধরে নিলাম ফারুক আমার চোখে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন আরেকবার “পোওও” করল। সেটাকে আমার কাছে ট্রিগার টানার শব্দ মনে হলো। শান্তা শেষ সময়ে “আব্বু” বলে চিৎকার করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা শান্তা না। এটা শান্তা-নাসিমা-ফাহিমার সমন্বিত কণ্ঠ। আমি বুঝতে পারছি প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো সময়ের রবিউল। শুধু সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রথমে আমার সামনের গাড়িকে ধাক্কা মারবে, তারপর আমাদেরকে। আগামীকালকে বনানীতে খোঁড়া হবে পাশাপাশি তিনটি কবর। রবিউলের কবরের পাশে কান্নার মতো মানুষ আছে, আমার কেউ থাকবে না।!

আমার খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করছে, ক্রসফায়ারের শাস্তিটা কি কেবল আমার হবে? আমার ঈশ্বরেরা কি শাস্তি পাবে না???
ট্রেনের শব্দ এবার আমার কানের মধ্যে ঢুকে গেল।

/ফেসবুক/জয়নাল আবেদীন

রাজনৈতিক হত্যাকান্ডকে আড়াল করতে বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

1 2 3