এননটেক্স নামের এক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার ৪০৪ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। নিয়ম ভেঙে এক গ্রাহককেই মাত্র ছয় বছরে এ ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকটি। আর এ কেলেঙ্কারির শুরু ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের সময়ে।
২০১১ সালে ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা দেয় পর্ষদ। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে ১৫১ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভী নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি এবং সুপ্রভ স্পিনিংকে আরও ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সুপ্রভ রোটর স্পিনিংকে দেওয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির সাবেক একজন পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যখনই ঋণ পরিশোধের সময় এসেছে তৎকালীন পর্ষদ তার নামে নতুন ঋণ দিয়েছে। আবার ওই সময়ে ঋণসীমার ক্ষেত্রে একক গ্রুপের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এ নিয়ে অন্য পরিচালকরা আপত্তি করার সুযোগ পাননি। তখন কৌশল করে ইউনুস বাদলের তিন গ্রুপের নামে তার ২২ প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেখানো হয়।বারকাতের পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদুজ্জামান।
জনতা ব্যাংক ভবন করপোরেট শাখার প্রস্তাবের বিপরীতে এননটেক্সকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়। ওই শাখার ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস ছালাম আজাদ। বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদকের করা মামলায় তার নাম ছিল। পরে মামলা থেকে অব্যাহতি পান। সম্প্রতি তিনি জনতা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে সরাসরি এমডি পদে নিয়োগ পান। এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে গতকাল জনতা ব্যাংকে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে কয়েক দফা টেলিফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ মো. ওয়াহিদুজ্জামান সমকালকে বলেন, যেভাবেই হোক আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তিনি (ইউনুস বাদল) ঋণ নিয়েছেন। বিষয়টি তার নেতৃত্বাধীন পর্ষদের নজরে আসার পরই কীভাবে টাকা আদায় করা যায় তার চেষ্টা করা হয়। তবে কোম্পানি চালু রাখার স্বার্থে পুরো টাকাটা কলব্যাক করা হয়নি। আবার নতুন করে চলতি মূলধন দিলে বিপুল অঙ্কের ঋণ সৃষ্টি হবে। এ কারণে উভয় সংকটে পড়ে প্রথমে কিছু টাকা দেওয়া হলেও পরে আর দেওয়া হয়নি। গত তিন বছরে তিনি আর টাকা ফেরত দিতে পারেননি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এননটেক্সের সার্বিক বিষয়ে পর্ষদে তথ্য উত্থাপনের পর তাকে (ইউনুস বাদল) ডেকে কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ অন্য ব্যাংকে নিয়ে যেতে বলা হয়।
আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পান এননটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউনুস (বাদল)। তার মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রফতানি।
তাই ব্যাংক পাড়ায় আলোচিত নতুনভাবে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি মূল ব্যক্তি আবুল বারকাত। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নিশ্চুপ তিনি। এড়িয়ে যাচ্ছেন ইস্যুটি। নানা কৌশলে আড়াল করছেন নিজেকে।
এসব বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৪টা ৭ মিনিটে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে ওয়েটিং পাওয়া যায়। পরে বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে আবারও কল করা হলে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, কি বিষয়ে বলেন। জনতা ব্যাংক সম্পর্কে জানার জন্য ফোন করেছি স্যার। বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি (আবুল বারকাত) বলেন, আমি এখন মিটিংয়ে আছি। সন্ধ্যার আগে ফ্রি হবো না। সন্ধ্যার পর কল করেন।
সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এর পর ৭টা ২৭ মিনিটে আবারও কল করা হলে তিনি বলেন, কে বলছেন আপনার পরিচয় দিন। নাম পরিচয় দেয়ার পর তিনি বলেন, কি বিষয়ে কল করেছেন। জনতা ব্যাংকের ঋণ বিষয়ে স্যার। বলা মাত্রই তিনি বলেন, আমি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগী দেখতে এসেছি। এখন কথা বলতে পারবো না।
এদিকে জনতা ব্যাংকের নিয়ম বহির্ভূত ঋণ দেয়ার বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। একটি অনুষ্ঠানে মুহিত বলেন, আবুল বারকাত (জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান) এত টাকা দিয়েছেন, আমি তো জানিই না। আমি জানি যে তার সময়ে বড় বড় বেনামি ঋণ দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, এখন আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো আসলে অনেক জটিল। এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় সে ব্যবস্থাই নেব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, এননটেক্সের বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দিয়ে সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখনো ওই চিঠির জবাব পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, গ্রাহকের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে তিন হাজার ৫২৮ কোটি টাকার ফান্ডেড ও এক হাজার ১২০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ১১টির অনুকূলে এখনও ‘প্রকল্প পরিপূরক প্রতিবেদন’ ইস্যু হয়নি। ফলে আদৌ এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত নয়
অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেছেন, দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে সমস্যা রয়েছে। ঠিকমতো হিসাবপত্র করলে দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সংগঠনটির নিজস্ব কার্যালয়ে মঙ্গলবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।আবুল বারকাত বলেন, অনেক সাহস করে এ প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে। কারণ অর্থনীতির নৈতিকতা নিয়ে কথা বলা চ্যালেঞ্জিং কাজ। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঠিকমতো হিসাব করলে দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে।