বাংলাদেশে আবার আসছে ‘ওয়ান ইলেভেন’

চন্দন নন্দী, কলকাতা, আগস্ট ১১, ২০১৮

সাউথ এশিয়ান মনিটর
——————————————————–
পুরো প্রতিবেদনটি নিচে দেয়া হলো –
“কঠোর অবস্থানে হাসিনা, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা; কী করবে বিএনপি?”
 
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম – একটি নিজস্ব প্রাক-নির্বাচনী জরিপ প্রতিবেদনে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রেক্ষাপটে এবং ‘সড়ক দুর্ঘটনার’ প্রতিবাদ সামাল দিতে দেরি করে ফেলায় সরকার যে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তাতে করে বাংলাদেশে ২০০৭ সালের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সেসময় রাজনীতিকে ‘স্থিতিশীল’ করতে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল সেনাবাহিনী।
 
সামরিক বাহিনী বল প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করবে, এমন কথা বলা হচ্ছে না। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেজর বা জেনারেলরা ট্যাঙ্ক বের করে সরকার উৎখাত করবে, এমন দিনও শেষ হয়ে গেছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পরও বিখ্যাত দুই বেগম প্রচণ্ড শক্তিতে একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ফলে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তার অবসান ঘটাতে ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। ওই সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সহিংস রাজনৈতিক সঙ্ঘাত এড়াতে সেনাবাহিনীর অধীনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী নিশ্চয়তা দানকারীর ভূমিকায় থাকার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সাল শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।
 
আজ আওয়ামী লীগ, অন্তত লীগের অংশবিশেষ, একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দমনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করাসহ অন্যদের স্থান দিতে পুরোপুরি অস্বীকার করায় আবারো কি নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সময় এসেছে? পরিস্থিতি কি ২০০৭ সালের মতো সেনাবাহিনীকে সামনে আসতে বাধ্য ও/বা অনুপ্রাণিত করবে? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আরো কিছু প্রয়োজনীয় বিবেচনাও – নির্বাচন স্থগিত করার পক্ষে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের অবস্থানের যৌক্তিকতা ভালোভাবেই তুলে ধরবে – যা নির্বাচনকে সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও অসদাচরণ থেকে বিরত রাখতে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ ফিরিয়ে আনা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দরকার পড়বে।
 
সাউথ এশিয়ান মনিটর’র সাথে আলাপকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার দেব মুখার্জি স্বীকার করেছেন যে শেখ হাসিনা সরকার ‘ভুল করেছে’ এবং এই সরকার যা করছে তা ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ অবসানে গৃহীত পন্থা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলমকে স্বেচ্ছাচারী কায়দায় গ্রেফতার করার মাধ্যমে প্রকট হয়েছে, এটা ‘খুবই অন্যায় ও বোকামি।’ অবশ্য দেব মুখার্জি আস্থার সাথে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন আয়োজন করবে। কারণ এই সরকার জানে যে তা করা না হলে তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়তে হবে।’ দেব মুখার্জি যদিও বলেছেন, নির্বাচন হবে, তবে তা কখন হবে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। ‘আগামী দিনগুলোতে অরাজনৈতিক সেনাবাহিনী কোন ভূমিকা পালন করবে, তা অনুমান করা কঠিন,’ বলেছেন তিনি।
 
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেবে তা স্পষ্ট না নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির অবস্থান কঠোর হতে থাকায় এবং নির্লজ্জতা প্রকট হওয়ায় একে ‘ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ’ করা হচ্ছে। গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি যে আওয়ামী লীগ আমাদের পার্টির জন্য এমন কঠোর অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন আমরাও সমানতালে কঠোর হই এবং আমাদেরকে জাতীয় আন্দোলন শুরু করার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।’ দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘জোরালো পক্ষপাতী’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যে আমাদের কোর্টে বল ফেলতে চাচ্ছে তা আমার সহকর্মীরা ভালোভাবে জানেন।’ এটা নিয়ে ‘দলের নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে’ বলেও জানিয়েছেন তিনি।
 
আরো পড়ুন : সীমান্তের ওপারে: ঢাকায় বিক্ষোভে হামলার জন্য ছাত্রলীগ ক্যাডারদের দুষলো কলকাতার ছাত্র সমাজ
 
বাংলাদেশের একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রাক-নির্বাচনী জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং আসন সংখ্যা দুই অঙ্কের নিম্ন প্রান্তিকে নেমে যেতে পারে – এ কথা হাসিনা জানেন। এরপরও নিরাপদ সড়কের জন্য ঢাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-পরবর্তী ঘটনাবলীতে দলটির ‘ব্যাখ্যাহীন’ অবস্থান রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের হতবাক করেছে। এখানে উল্লেখ করা ঠিক হবে যে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) ২০১৭ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত এক জরিপে বলেছে, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সার্বিক সমর্থন রয়েছে ৬৬ ভাগ, যার মধ্যে ‘জোরালো সমর্থন’ (৪৫ শতাংশ) এবং ‘কোনোরকম সমর্থন’ (২১ শতাংশ)…’। অবশ্য এই জরিপ হয়েছিল সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভের অনেক আগে।
 
ঢাকা-ভিত্তিক আরেক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী তফসিলে অটল থাকবে নাকি অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করবে, তা অক্টোবরের শুরুতেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এ থেকে পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্ষমতাসীন দলটি তার রাজনৈতিক-নির্বাচনী কার্ডটি খেলবে ঈদ উৎসব শেষ হওয়ার পর। ওই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধান বলেন, বিএনপি জাতীয় আন্দোলন শুরু করতে পারে। যদিও দলটি জানে যে এ ধরনের দীর্ঘ মেয়াদি কর্মসূচি সফল করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি তার নেই। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগকে তার নিজের ও বাংলাদেশের ভালোর জন্য বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনের একটি পথ বের করতে হবে বলে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন তিনি।
 
ঘরোয়া রাজনীতির আগ্রহী পর্যবেক্ষক, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক জেনারেল বলেন, আওয়ামী লীগের ‘জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার’ প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলটি পরিস্থিতি সামাল দিতে দুটি পথ ধরতে পারে। প্রথমত, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচন স্থগিত করতে পারে এবং আসন্ন নির্বাচনী পরাজয় এড়ানোর জন্য একটি নির্গমন পথ খুঁজে নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠনের জন্য নির্বাচন স্থগিত করা, ধরা যাক দুই বছরের জন্য। এটা ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে আওয়ামী লীগকে ঝকঝকে পরিষ্কার করে দেবে বলে মনে করেন ওই জেনারেল।
 
বাংলাদেশী নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ, বিশেষভাবে যারা আগে সেনাসমর্থিত সরকারে কাজ করেছিলেন, মনে করেন, জাতীয় ঐক্যের সরকারের পক্ষে আমেরিকানদের থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ভারতীয়রা কী করবে তা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেইজিং একটি দলের বদলে অন্য কোনো দলকে এগিয়ে নিতে সরাসরি কোনো ভূমিকা পালন করবে না। তবে তারা চাইবে, নতুন সরকার গঠিত হওয়া মাত্র তার উপস্থিতি যেন অনুভূত হয়। অবশ্য বাংলাদেশী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, চীনাদের যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারতীয় ও আমেরিকানরা একযোগে কাজ করবে।
 
আরো পড়ুন: বাংলাদেশের বিক্ষোভ সরকারের গভীর নিরাপত্তাহীনতার দিকটি তুলে এনেছে
 
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও একমাত্র যে বিকল্প পথ হলো ২০০৭ সালের মতো কিছু একটা। অবশ্য এবার হতে পারে এক বছরের সংক্ষিপ্ত বিরতির মতো। এমনটা হতে পারে সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে।
 
২০০৭-২০০৮ মেয়াদে হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালনকারী পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী স্বীকার করেন যে ঢাকার রাজপথের বিক্ষোভ দমনে আওয়ামী লীগ ‘নিশ্চিতভাবে রূঢ় আচরণ’ করলেও এবং দলটির মধ্যে অন্যান্য ঘাটতি থাকলেও ভারতের কাছে ‘বিকল্প আছে সামান্যই।’ কারণ (দিল্লির বিবেচনায়) বিএনপি এখনো রয়েছে ধূসর এলাকায়।’ ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের ইতোপূর্বে খালেদা জিয়ার লন্ডনভিত্তিক ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে ‘খাতির জমাতে’ চাওয়ার কথা স্মরণ করেন। তবে বলেন, তিনি সরে গেলে বিষয়টি চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
 
গত প্রায় এক যুগ ধরে ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের সাথে ‘আরো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত’ হতে চেয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানের সাম্প্রতিক পাঁচ দিনের সফরকে ঢাকাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধান ‘শুভেচ্ছা সফর’ হিসেবে অভিহিত করলেও অন্য জ্ঞাত সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশী অতিথির সাথে ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা’ হয়েছে। দেশব্যাপী আন্দোলনে বিএনপির ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ’ ‘কোনো ধরনের বহিরাগত মদতের’ পথ সৃষ্টি করে কিনা তা ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্ট আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করছে।
 
নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপি প্রকাশ্যে আগে থেকে বলা ‘সবার জন্য সমান সুযোগ প্রস্তুতের’ দাবি তুলতে থাকবে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, তার দল যদি ওই দাবির প্রতি অটল থাকে, আর আওয়ামী লীগ যদি তার বর্তমান অবস্থান থেকে না নড়ে তবে আইন-শৃঙ্খলায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যান্য শক্তির হস্তক্ষেপ করার ‘সম্ভাবনা’ থাকবে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি হয়তো অখুশি হবে না।

“ম্যায় রাজা বনুঙা!”

শামসুল আলম
______________
নো! মিস্টার জেনারেল, আপনি এখন সত্য বলছেন না। আপনি একটা মিথ্যুক। রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে আপনি এখন নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করতেছেন? কেনো? কিসের ভয় আপনার? আপনি সত্যি যদি কোনো মিলিটারী জেনারেল হয়ে থাকেন, তাহলে বাপের ব্যাটার মত সত্যটি বলতে পারতেন- “হ্যা, আমি রাজা হতে চেয়েছিলাম!”–“কিংস পার্টি গঠন করে করে বেসিক ডেমোক্রেসির মত ইনডাইরেক্ট নির্বাচন করে আমি প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি।” তখন আপনার শিষ্য বারীর পরামর্শে আজহার আলী সরকার ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি হতে চান জেনারেল মইন!” একই কথা ব্রিগেডিয়ার বারীও বলেছিলেন বিএনপির কয়েকজন এমপিকে! দেশের তৎকালীন মিডিয়াতে এ সংক্রান্ত বহু প্রমান রয়ে গেছে।
 
বিষয়টি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর এবারের ঈদ বিশেষ সংখ্যায় ১/১১ শিরোনামে ২২ পৃষ্ঠার এক বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন, যার মধ্যে ঐ ঘটনার কুশীলবদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। যার প্রেক্ষিতে এ লেখাটি লিখতে হলো।
 
জেনারেল সাহেব। এখন ইনিয়ে বিনিয়ে আপনি যতই বলুন না কেনো- তখন দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল, হরতাল ধর্মঘট ছিল, রাস্তায় মারামারি ছিল, মানুষ কষ্টে ছিল, তাই আপনি দেশ উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আপনি ঐ অঘটনের অন্তর্নিহিত সত্যটি প্রকাশ করছেন না। দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল এটা সত্য, কিন্তু তাই বলে আপনি সেনাপ্রধান বা ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান ব্রিগেডিয়ার বারী রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্থা জারী করতে পারেন না! ওই কাজ করার কোনো ম্যান্ডেট বা উপযুক্ত ক্ষমতা আপনাদের ছিলনা। তদুপরি আপনারা তা করেছেন। ইলেকশন একপেশে হলেই তাতে ইন্টারফেয়ার করা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়। যদি তাই হতো, তবে ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচন নিয়ে কেনো কথা বলছেন না, এই ভোটারবিহীন বয়কটের নির্বাচনের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া তো জরুরী অবস্খা জারী করেননি। তার মানে দাড়ায়, আপনি এবং আপনার সাথীরা তখনকার রাজনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল করতে গিয়েছিলেন। আপনি এবং বারী দু’জনেই জানিয়েছেন, আপনারা অনেকদিন থেকে সলাপরামর্শ করছেন- জরুরী অবস্থা জারী করতে চান। জেনারেল মাসুদের সাথেও এ বিষয় নিয়ে পরামর্শ করেছেন। কিন্তু বারী ১১ জানুয়ারির আগেই ঘটনা ঘটাতে চাওয়ায় আপনি তাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন- অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ে ইন্টারফেয়ার করবেন! তার মানে, আপনারা ১/১১র জন্য পরিস্থিতি তৈরী করেছিলেন, অথবা সুযোগের অপব্যবহার করেছেন! উল্লেখ্য ওয়ান ইলেভেনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে ১০ জানুয়ারী সকাল পৌনে দশটায় হঠাৎ তেজগাঁও, রোকেয়া স্মরণী এবং সাভারে বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় একযোগে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। ভস্মীভূত হয়ে যায় তেজগাঁওয়ের নাসসা গ্রুপ, পদ্মা ফ্যাক্টরী সহ অনেক গার্মেন্টেস। সেই আগুণ লাগানো অর্গানাইজ করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার বারীর পরিকল্পনায়। পুরোটাই ছিলো আপনাকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট সহিংস করা, শিল্পে আগুণ দেয়া ও মানুষ মারার কৌশল!
 
৫ থেকে ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৫ জানুয়ারী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করে সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করেন। পরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী সেনানিবাসে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে ১/১১র বিষয়াদি চুড়ান্ত করেন। হাবিব ভিলাতে বিউটেনিসের সাথে আপনার বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারন করেন- আপনি সামরিক শাসন জারী করে রাষ্ট্রপতি হতে চাইলেও বিউটেনিস রাজী না থাকায় জরুরী অবস্থা নিয়েই খুশী থাকতে হয় আপনাকে!
 
চৌধুরী ফজলুল বারীর মত সেনা অফিসার, যাকে মেজর থেকে তুলে বিএনপি অকালে ব্রিগেডিয়ার বানায়, ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্ব পালন করেও বারী যখন প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে মন্তব্যে “দেশের মানুষরে পাছায় লাত্থি দিয়া” জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করেন, তখন ভাবনা হয়, এ কি কোনো সেনা অফিসার, নাকি রাস্তার মস্তান? জনগন ও রাজনীতিকদের নিয়ে এ জাতীয় অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ বড়ই আনপ্রফেশনাল এবং অসভ্যতা! ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবে গোয়েন্দা বিষয়সমুহ নিয়ে বারী অবহিত করবেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিনকে। ওটাই তার কাজ। অথচ তিনি সেটা না করে ডাইনে বামে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন, রাষ্ট্রের গোপন তথ্যাদি শেয়ার করেছেন আপনার ভাই টিপু সহ আরও বহু জনের কাছে। এমন কিছু ঘটনা আমারও জানা আছে। আপনার কাছে বার বার ছুটে গিয়ে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছিলেন বারী! বারীর ভাষায়- “আমি বারে বারে ইনসিস্ট করলাম”, “মেকানিজম যা করার করা হইল”–তিনি নিজেই বলে দিচ্ছেন সবকিছু করা হয়েছে মোকানিজম করে! Who he was to insist? এসব কাজ মারাত্মক আনপ্রফেশনাল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।
 
ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হয়ে বারী ঘনঘন আপনার কাছে গিয়ে ফুসুর ফাসুর করতো কেনো? ওটা ছিল ষড়যন্ত্র! কোনো অবস্খাতেই তিনি ঐসব করতে পারেন না। প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেশের অবস্থা রিপোর্ট করার বদলে তিনি আপনার কাছে কেনো ফন্দি আঁটতে যেতেন কেনো? সেনাপ্রধান তো তার বস ছিল না। ১১ জানুয়ারি দুপুরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে আইন শৃঙ্খলার মিটিংয়ে বারী যোগ দিতে গেলেন, অথচ তার পকেটে ছিল জরুরী অবস্থার কাগজ! এরপরে কি আর বলার কোনো দরকার আছে যে- “আমরা করি নাই, যা করার ইয়াজউদ্দিন করছে”? কত বড় বেইমান ও মোনাফিক হলে এসব করা সম্ভব- কল্পনা করা যায়! ঐসময় আপনার অফিস থেকে আপনি ফোন করে বারীকে বলেন- “আমি আসতেছি, তুমি থাইকো!”
 
সেদিন বঙ্গভবনে আপনার কোনো এপয়েন্টমেন্ট ছিল না, অথচ এমএসপি মেজর জেনারেল আমিনুল করিমের সঙ্গে লাইন করে বঙ্গভবনের গেট থেকে পিজিআর সরিয়ে দিয়ে আপনি এবং আপনার বাহিনী অনুপ্রবেশ (invade) করিয়েছিলেন। পিজিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার আবু সোয়াহেল যখন আপনাকে বঙ্গভবনের গেটে আটকে দেয়, তখনই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে আপনি কর্নেল এমদাদকে নির্দেশ দিয়ে পিজিআর সরিয়ে ভেতরে ঢোকেন, সেই এমদাদকেও পরে বিডিআরে পাঠিয়ে পিলখানায় হত্যা করা হয়!
 
যাই হোক, বঙ্গভবন নিয়ে ষড়যন্ত্রটা ছিল খুব পরিস্কার। আপনারা যখন রাষ্ট্রপতিকে আটকে ফেললেন, তখন আপনিসহ তিনজন সশস্ত্র অবস্থায় ছিলেন। তারপরে রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্খার কাগজে সই করালেন আপনি! রাষ্ট্রপতির কক্ষে সশস্ত্র অবস্থায় যাওয়ার এখতিয়ার কি ছিল আপনাদের? মোটকথা, আপনারা রাষ্ট্রপতিকে ভয় দেখিয়েছিলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার বারী পকেট থেকে বের করেছিল প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র, জরুরী অবস্খা জারীর আদেশ, রুলস, ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ড্রাফট। এর মানে যা দাড়ায়, ক্ষমতা দখলের সকল প্রস্তুতি নিয়েই বঙ্গভবনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন আপনারা! আপনার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা দখল করা, এবং সেজন্য মার্শাল জারী করতে না পেরে জরুরী অবস্থা দিয়েই ধরপাকড়, নির্যাতন, সহায় সম্পদ ভাঙচুর করে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি আপনি ডি-ফ্যাক্টো সামরিক রুলার হয়ে বসলেন। প্রথমেই আপনার বাহিনী দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে রাজনীতিবিদদের ধরপাকড় শুরু করে। সারাদেশে চলে অবৈধ হাট-বাজার আর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। অন্যদিকে তাদের টার্গেট ছিল দেশের সকল অঞ্চলের সব শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের শিকার হন রাজধানী ও মফস্বলের উঁচু ও নিচু পর্যায়ের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মী। আর ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী- ভেঙে ফেলা হয় যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার। উচ্ছেদ করা হয় শহরের ফুটপাতের হকারদের। উপড়ে ফেলা হয় বহু বস্তি ও উপশহর। কর্মহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। অসহায় হয়ে যায় অসংখ্য পরিবার। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে হু হু করে। সাধারণমানের চালের কেজি ৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। মনে কি পড়ে সেসব?
 
জেনারেল মইন। আপনি এখন বাটে পড়ে দাবী করছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব নাকি আপনাকে ‘ড্রাফট চিঠি’ পঠিয়ে শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে বাংলাদেশের সৈনিকদের বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন? কিন্তু জেনারেল সাহেব, ওই ড্রাফট পত্রের গল্পটি যে স্রেফ আপনার বানোয়াট, তা স্বীকার করতে দ্বিধা কেনো? জাতিসংঘ আপনাকে ‘ড্রাফট পত্র’ পাঠাতে যাবে কেনো? চাইলে তারা ফরমাল চিঠিই পাঠাতে পারতেন। আর ইউ টকিং লাইক এন ইডিয়েট? জাতিসংঘের তৎকালীন ঢাকাস্থ প্রতিনিধি রেনাটা ২০১০ সালে সাক্ষাৎকার দিয়ে পরিষ্কার বলেছেন, ঐরূপ কোনো চিঠি জাতিসংঘ থেকে পাঠায়নি। তাছাড়া সাবেক আইজিপি খোদাবক্স জাতিসংঘের কর্মকর্তার সাথে পরে কনফার্ম হয়েছেন, জাতিসংঘ ঐরূপ কোনো চিঠি পাঠায়নি। অর্থাৎ আপনি জাতিসংঘের নামে বানোয়াট চিঠির গল্প বলে রাষ্ট্রপতি ইয়াউদ্দিনকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, মিষ্টার মইন। স্বীকার করুন।
 
জেনারেল সাহেব, এখন আপনি যতই বলছেন- আমরা কিছু করিনি, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সব করেছেন, আসলে তা সত্যি নয়। এসএসএফের সহায়তায় রাষ্ট্রপতিকে তখন প্রায় বন্দী করে রেখেছিলেন আপনারা, এটা রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্টজনরা আমাকে বলেছেন। ঐ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির উপর জোর প্রয়োগ করে জরুরী অবস্থার কাগজে সই নিয়ে সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেছিলেন আপনি! সেদিন বিনা রক্তপাতে বঙ্গভবন দখল করতে আপনার নেতৃত্বে কয়েক’শ সেনাকর্মকর্তা ভিতরে এবং বাইরে অবস্থান নিয়েছিল। বঙ্গভবনের ভেতরে ও বাইরে এ সময় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির বেডরুমের বাইরেও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে সেনা কর্মকর্তা দন্ডায়মান ছিল। আপনার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ সাভার সেনানিবাস হতে শত শত সৈন্য নিয়ে ট্যাংক সহ ভারী অস্ত্র সহ হাজির হন বঙ্গভবনে। ট্যাংকবাহিনীর উপস্থিতির আগ পর্যন্ত আপনার কথামত সাক্ষর করতে রাজী হননি রাষ্ট্রপতি। তিনি যখন দেখলেন- জেনারেল মাসুদও আপনার সাথে হাত মিলিয়েছে, তখন বয়োবৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি নিরুপায় হয়ে আপনার নির্দেশমত কাগজপত্রে সাক্ষর করেন! এ প্রসঙ্গে আপনার লেখা নিজের উক্তি, “আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না, আমি যা করতে যাচ্ছি তাতে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি বিদ্যমান। কিন্তু দেশ ও সেনাবাহিনীর প্রশ্নে আমি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হয়ে উঠলাম।”—-“কিন্তু আমি তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, পরিস্থিতি যাই হোক, যতো ঝুঁকিপূর্ণ হোক, আমি আমার চেষ্টা করবো।” এ সময় রাষ্ট্রপতি তাঁর স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলেও আপনি সে অনুমতি দেননি। কেননা আপনি জানতেন বার বার ব্যর্থ হবার পরে এবারে ব্যর্থ হলে নির্ঘাত মৃত্যু। মনে কি পড়ে- ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল হোটেল শেরাটনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে কে যেনো ঘোষণা করেছিল- ‘অউন ব্রান্ড ডেমোক্রেসি’ চালু করব? সেটাই কি আপনি? দেশে কেমন গণতন্ত্র থাকবে- সেটা ঠিক করার আপনি কে ছিলেন?
 
ড. ইউনুসকে চীফ এডভাইজার বানাতে চেয়েছিলেন আপনি এবং আপনার জেনারেলরা, তিনি রাজী নয় হওয়ায়ে পরে ফখরুদ্দিনকে বানিয়েছিলেন কোন্ সাংবিধানিক ক্ষমতায়? আপনাদের সে ক্ষমতা দিয়েছিল কে? সংবিধান, নাকি জনগন? কেউ দেয়নি, অথচ ঐ অপকর্ম করে আপনারা সংবিধান লংঘন করেছিলেন। কারন সংবিধান অনুসারে- কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে চীফ এডভাইজার করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সেটা কি করা হয়েছিল? না। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল বলতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল অর্থাৎ বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত, জাপা ইত্যাদি। তাদের সাথে রাষ্ট্রপতি অফিসিয়াল পরামর্শ ছাড়া কেবল আপনাদের কথায় ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন না। অথচ সে কান্ডটাই হয়েছে! আপনি এবং বারী বলছেন, আপনারা এডভাইজার ঠিক করেছেন, কারও কারও নাম উঠেছে, আবার বাদও দিয়েছিলেন আপনারাই! কি ক্ষমতা!!! আপনাদিগকে এসব করার ক্ষমতা কে দিয়েছিল? মোটকথা ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন আপনারা কয়েকজন জেনারেল। আপনাদের সেই অধিকার ও ক্ষমতা সংবিধান দেয়নি। তাই ফখরুদ্দিনের নিয়োগ এবং তার সকল কর্মকান্ড অসাংবিধানিক। একদিন না একদিন এটা অবৈধ ঘোষণা করবে উচ্চ আদালত। সময় আসলে এনিয়ে আমিই রীট করতে চাই। দেখা গেছে, জরুরী সরকারের সময়ে বিদেশ থেকে আগত মন্ত্রী এবং বিশিষ্টজনরা প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি আপনার সাথেও সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হতো! মিস্টার জেনারেল, বলুন তো- এদেরকে আপনার কাছে কেনো পাঠাতো ফরেন অফিস? কারন, আপনি তখন ডিফ্যাক্টো রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশ চালাচ্ছিলেন, এটাই সত্য। ফখরুদ্দিন এবং তার উপদেষ্টারা আপনার হুকুমে চলত। উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে হঠাৎ ঢুকে আপনি এটা সেটা নির্দেশও দিতেন। এসব কি সেনাপ্রধানের কাজের মধ্যে পড়ে? জরুরী অবস্থা হলেও সেনাপ্রধান তা করতে পারেন না। অথচ আপনি ঐসব কান্ড করেছিলেন!!
 
২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আপনি ভারতে গেলেন পূর্নভাবে ক্ষমতায় বসার এজাজত আনতে- অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হতে। তাদের সমর্থন পেলেন না। উল্টো, তারা আপনাকে বললো- তাদের সমর্থনপুষ্ঠ দলের হাতে (অর্থাৎ আ’লীগের কাছে) ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। ( এর ঠিক এক বছর পরে সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটানো হয় পিলখানা ম্যাসাকার- এটা কি কাকতালীয়, নাকি সুপরিকল্পিত, তা ভেবে দেখা উচিত) এর বিনিময়ে আপনি লাভ করলেন সেইফ এক্সিটের নিশ্চয়তা। তারপরে যা হওয়ার তাই হলো- শেখ হাসিনার সাথে বসুন্ধকার সেইফ হাউজে বসে সবকিছু চুড়ান্ত হলো আপনার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল আগেই তৈরী করা ছিল। হাসিনাকে দেয়া হলো এমন সংখ্যক সিট, যাতে প্রয়োজনমত সংবিধান সংশোধন করেও প্রতিবেশীর সকল চাহিদা পুরণ করতে পারেন। বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া হবেনা- সেটা গোয়েন্দাসূত্র আমাকে জানিয়েছিল ঠিক চার দিন আগে। এভাবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধংস করে দিয়ে হাসিনার কাছে আপনি ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন, আর ভারতের রাডারের মধ্যে বাংলাদেশটাকে ঢুকিয়ে দিলেন আপনি–যেটি পাওয়ার জন্য তারা তিন যুগ ধরে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে আপনি মস্তবড় রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ সংঘটন করলেন।
 
এতদিন চুপ ছিলাম, এখন কিছু সত্য প্রকাশ করি_____________
আমি সেই শামসুল আলম, যার ফোন পেয়ে ২০০৫ সালের মধ্য জুনের এক বিকেলে আপনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ছুটে এসেছিলেন, অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করার পরে আপনাকে চীফ বানানো হলো, সেকথা আপনার বইতে উল্লেখ করেছেন। আমি বেসামরিক অফিসার হলেও আপনাদের ফৌজি খবরাদি যেভাবেই হোক আমার কানে চলে আসত। আমি হলফ করে বলতে পারি- ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে জামায়াতের কর্মী হত্যার ঘটনার সাথে আপনাদের আগে থেকেই যোগসাজস ছিল। ওই রকম ঘটনা ঘটবে, তা আপনারা আগেই জানতেন, নইলে পরে কি করবেন তার পুর্বপ্রস্তুতি নিয়েছিলেন কেনো? তারও কয়েকমাস আগে থেকে বিএনপির মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের নাম ঠিকানা ছবি সহ তালিকা তৈরী করছিল গোয়েন্দা অফিসাররা- পরে জানা গেলো কাকে কাকে ধরা হবে সেই লিস্ট তৈরী করছিলেন। এমনকি বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের ফোনে আড়ি পেতে তাদের অনিয়ম ও দুর্বল পয়েন্ট ধরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রোফাইল তৈরী করা হয়, যা দিয়ে পরবর্তীতে তাদেরকে হেনস্তা করা হয়, জেল দেয়া হয়! ঐ লিস্ট তৈরীর উপাদান (মন্ত্রি-এমপিদের হালনাগাদ ঠায় ঠিকানা ছবি) সংগ্রহ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমার কাছে দু’দফা সেনা কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছিল, যদিও সেটা তারা পায়নি।
 
পল্টন হত্যার পরের দিন ২৯ অক্টোবরেই আপনারা জরুরী অবস্থা জারী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেকোনো ভাবেই হোক, এ সংক্রান্ত সকল অর্ডারের ড্রাফট ডকুমেন্টগুলি কেবল আমার হাতে জমা করা ছিল। আমাকে বলা হলেও আমি সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হ্যান্ডওভার করিনি, বরং কায়দা করে জরুরী অবস্থা ঘোষণা বন্ধ করতে সক্ষম হই। তদুপরি আপনাদের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। দ্বিতীয় দফায় চিটাগাঙ পোর্টকে কেন্দ্র করে নভেম্বরের ১৭ তারিখে জরুরী অবস্থা জারীর চেষ্টা করা হয়। সে চেষ্টাও আমি একাই বন্ধ করেছিলাম। তৃতীয় দফায়, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে আপনার নির্দেশে সারাদেশে সেনা মোতায়েন করা হয়, যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতির অজ্ঞাতেই তা করা হয়। সেটি ছিল আপনার ফিল্ড প্রস্তুতি! তখন একজন জেনারেল মারফত খবর পেলাম- ২২ জানুয়ারির ইলেকশন বানচাল করা হবে, এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে মার্শাল’ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করবেন আপনি; ম্যাডাম জিয়া সহ তাঁর ছেলেদের কারাগারে আটকে বিএনপির কন্ট্রোল নিবেন আপনি। এসব বিষয় ম্যাডামকে জানালেও তিনি ওভারলুক করেন, কারন বারী এবং তাঁর এক আত্মীয় উল্টা বুঝিয়েছিলেন।
 
১/১১ পরে ডিজিএফআই থেকে আমাকে বলা হয়েছিল মান্নান ভু্ঁইয়ার বাসায় যেতে, কিন্তু আমি তাতে রাজী হইনি। অতঃপর কিছুদিন পরে আপনাকে উৎখাতের একটি পরিকল্পনা একজন জেনারেল আমাকে অবহিত করেছিলেন, সে খবরটা আমি যথাস্থানে পৌছে দিয়েছিলাম। পরে সম্ভবত বিএনপির এক সিনিয়র নেতার বেইমানীর কারণে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ঐ ঘটনার পর থেকেই আমাকে খোঁজা শুরু করে আপনার মেজর সাহেবরা, বাসা রেইড দেয় তিন বার। আগেই টের পেয়ে আমি বাসা ছাড়লাম। কিন্তু আপনারা আর খুঁজে পেলেন না। পরে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, আমাকে ফিনিশ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে! আলহামদুলিল্লাহ।
 
জেনারেল সাহেব। ১/১১ দ্বারা বাংলাদেশকে পরাধীন করে, পিলখানা ম্যাসাকার করে আর্মি শেষ করে দিয়ে আপনি বিদেশে পালিয়ে বেঁচে আছেন নির্জনে। তবে মিথ্যার ওপরে বেঁচে আছেন। এভাবে আর কদ্দিন? এই জীবনে তো আর দেশের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না। আপনি বাংলাদেশের যে চুড়ান্ত ক্ষতি করেছেন, তার বিচারে আপনার সর্বোচ্চ শাস্তি পাওনা, ভাগ্যে থাকলে সে শাস্তি ভোগ করাও লাগতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে মৃত্যু হবে পাপিষ্ঠের মতন, তখন জনগন আপনার কবরে থু থু দিবে। যদি মানুষ হয়ে থাকেন, তবে সত্য কথা বলুন, কৃত অপরাধ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চান।

/ফেসবুক

একজন ‘সামান্য মেজর’ – অসামান্য এক জীবন

শিবলী সোহায়েল

[]

সামান্য মোজা

…যা হোক — বসে আছি।হঠাৎ পাশের কক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথোপকথনের একাংশ কানে এলো। সবাই জানেন, বিদেশে গেলে সচরাচর তারা কোনো কেনা-কাটা করতেন না। প্রয়োজন বোধে এক জোড়া মোজা সম্ভবত বেগম  জিয়া কিনেছিলেন। বললেন, ‘এক জোড়া মোজার দাম দেশী টাকায় এক শতেরও বেশি। এই দামে মোজা কেনা যায়? আমার আর কিছু কেনার নেই ভাগ্যিস।’ উত্তর এলো, ‘এ দামে আমাদের কেনার দরকারও নেই,  সামর্থ্যও নেই। গরিব দেশের নির্ধন প্রেসিডেন্ট। যখন দেশের মানুষের সঙ্গতি হবে, প্রেসিডেন্টেরও হবে।’  অপর দিকে সম্মতি সূচক নীরবতা।
 
উপরের কথাগুলো এসেছে ইনাম আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনায় তার লেখা “ভাবনায় বাংলাদেশ” বইটিতে।এটা সম্ভবত ছিলো উনিশ’শ  আশি সালের কথা ইনাম আহমেদ চৌধুরী তখন লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের অর্থনৈতিক সচিব হিসেবে কর্মরত  ছিলেন। সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে সরকারি এক সফরে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন সেখানে।
 
এভাবেই সাদামাটা জীবন যাপন করে এক ‘সামান্য মেজর’ তাঁর অসামান্য জীবনের ছাপ রেখে গিয়েছেন এদেশের  ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ‘সামান্য মেজর’ কেন বলছি, সে কথায় একটুু পরে আসছি। তার আগে আরো দু’একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করবো।

সামান্য ঘড়ি  পরিবার

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার ‘ফেলে আসা দিনগুলি’ বইয়ে জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন – “………অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ছে। আপনার (জিয়া) সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে, অনেক মিল আছে। অাপনি যুদ্ধের সময় যে ঘড়িটা ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সে ঘড়িটা হাতে আছে। ……তখন যুদ্ধ করা, হানাদারদের আঘাত করা, দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ছাড়া অন্য কোন ব্যাপার আমাদের মাথায় ছিল না। সেসময় ভাবীদের কি অবস্থা হবে, তারা কোথায় থাকবে, ভারতে চলে আসবে কিনা – এসব ব্যাপার নিয়ে যখন কথা বলছিলেন তখন আমি আপনার সামনে ছিলাম। আপনি তাদেরকে বলেছিলেন –‘তারা কোথায় থাকবে, কি করবে সে বিষয়ে ভাববার অবকাশ নেই। তাদেরকে তাদের মত করে সেভ থাকতে বলো। …”

উপরের এ উক্তির কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, তবে সামান্য দু’টো বিষয়ের মধ্যে দুইটি অসামান্য শিক্ষা আছে।এক, তিনি জানতেন রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদার সাথে বিলাসবহুল ঘড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছেদের কোন সম্পর্ক নেই। আর দ্বিতীয়টি হল দেশের প্রয়োজনকে পরিবারের উপরে স্থান দেওয়া। মুখে বলতে পারলেও বাস্তবে সবাই এ কাজ পারেনা আর তাই এই ছোট ছোট সামান্য কাজগুলোই তাকে আরও অসামান্য করে তুলেছে।

এছাড়া পরিবারের কথা যখন চলে এলো তখন তাঁর পরিবারের আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। দুই হাজার সতেরো সালের নভেম্বর মাসে উনার ছোট ভাই আহমেদ কামাল নীরবে চলে গেলেন নাফেরার দেশে। কোথাও তেমন কোন সাড়া শব্দ শুনতে পেলাম না। পারিবারিক বন্দনার যুগে যখন একজন রাষ্ট্র প্রধানের নাতিপুতিরাও রাষ্ট্রীয় খরচে নিরাপত্তা ও নানা সুযোগ সুবিধা ভোগ করে তখন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের আপন ভাই ছিলেন এতোটাই অপরিচিত!

সামান্য খাবার

 

একজন রাষ্ট্রপ্রধান বিলাসবহুল জীবন যাপন করবে, তার সঙ্গে একসাথে খাবার খেয়ে এসে মানুষ সেই খাবারের গল্প করবে জীবনভর, এমনটাই আমরা সবসময় দেখে আসছি। কিন্তু নিচের দু’টো ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম।

সাংবাদিক এ বি এম মূসার বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই –
“একটু পরে জিয়া গোসল করে এলেন। আমরা চারজন খেতে বসলাম। খাবারের পরিমাণ ও রকম দেখে একটুখানি দুশ্চিন্তাও দেখা দিল। বুঝলাম জিয়া অত্যন্ত স্বল্পাহারী, আমার ভাগ্যেও অর্ধাহার। তিনি এককাপ স্যুপ, দু’তিন চামচ ভাত, দু’টুকরা মুরগির গোস্ত, এক চামচ সবজী নিলেন। তাঁর দেখাদেখি আকবর, দাউদ ও আমিও তাই নিলাম। জিয়া চেয়ে দেখলেন, কিছু বললেন না, তবে মনে হল একটুখানি মুচকি হাসলেন।”

বিশিষ্ট লেখিকা হেলেনা খানের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি –
“রোজার মাস।ময়মনসিংহ সার্কিট হাউসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে এফতারি করার দাওয়াতে স্বামীসহ আমি শরিক হই। শুধুমাত্র সামান্য কাঁচা ছোলা, আটার মোটা রুটি ও ঘি-বিহীন বুটের ডালসহ গরুর গোশত অতি সাধারণ আয়োজন! শুনেছিলাম প্রেসিডেন্ট সাহেব ব্যক্তিগত সব ব্যাপারেই স্বল্প ব্যয়ের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর ইচ্ছাতেই সেদিনের ইফতারির ওই আয়োজন।”

এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো অসংখ্য ঘটনা আছে, যা একসাথে করলে একটি বই হতে পারে। পরিমিত জীবনের তথ্য ছাড়াও তাঁর সেনানায়ক হিসেবে ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসী পদক্ষেপ, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশ পূনর্গঠনের প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা যেকোনো রাজনৈতিক নেতা, সেনাপ্রধান এবং প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়ার কথা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এসবই এখন সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার জন্য পরিকল্পিত এবং সংগঠিত একপ্রচেষ্টা করা হচ্ছে বাংলাদেশে। তাঁর অসামান্য কাজগুলোকে অস্বীকার করে তাকে এখন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলা হচ্ছে, “সামান্য এক মেজর”!

[২]

“সামান্য এক মেজর”- কথাটি আজকাল প্রায়শ শুনতে পাওয়া যায়। এ মন্তব্য কি শুধুই তাকে ছোট করার জন্য? নাকি এর গভীরে আরো অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে? কথাটি আমি প্রথম শুনি দুই হাজার দুই অথবা তিন সালের দিকে, সিডনীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মাণনা প্রদান অনুষ্ঠানে সেখানে এক বক্তা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হঠাৎ করে চিৎকার করেই বলে উঠেন, “কোন এক সামান্য মেজর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়!” আমি মনে মনে ভাবলাম, উনি কি বলতে চাইছেন যে আরব থেকে “উঁচা-লম্বা ফর্সা” কোন শায়খ অথবা ভারতের রাজবংশের কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে উনার জন্য মেনে নেওয়া সহজ হতো? সামান্য মেজরের অসামান্য কাজ মেনে নিতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

প্রথম দিকে আমি ভেবেছিলাম এটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার একটা কৌশল মাত্র। কিন্তু কিছুদিন বিষয়টি একটু মনযোগ দিয়ে লক্ষ করে দেখালাম এর সাথে আরো কিছু যুক্ত আছে। শুধু তাঁকে খাটো করাই হচ্ছে না, বরং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ধীরে ধীরে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর কাজটা জোরালো ভাবে শুরু হয়েছে দুই হাজার নয় সালের পর থেকে যদিও এর পরিকল্পনা হয়েছিলো উনিশ‘শ একাশি সালের মে মাসের দিকে মতিয়ূর রহমান রেন্টুর “আমার ফাঁসি চাই” বই থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকতে পরিকল্পনাটা ছিলো এরকম যে- প্রচার করতে হবে “এই জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া নয়।” সেই পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতায় আজকে তাকে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর গুপ্তচরও বলা হচ্ছে। কিন্তু কেন? শুধুই কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? না, তা নয়। দৃশ্যপটের ভেতরে আরও যে গভীর ষড়যন্ত্র আছে তা আমাদেরকে বুঝতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অথবা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই যদি তাঁর ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠতো তাহলে তা ভিন্ন বিষয় ছিলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেসময় কোন বিতর্ক তো দুরের কথা বরং স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাকে মূল্যায়ন করে সেসময় তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধি দেওয়া হয়। এ নিয়ে খুব বেশী তর্কের দরকার পড়েনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্য থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন –

“… চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্ট্যালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য চট্টগ্রাম আজও শত্রুর কবল-মুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের কিছু অংশ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ণ নোয়াখালী জেলাকে “মুক্ত এলাকা” বলে ঘোষণা করা হয়েছে।”

স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা সামরিক-বেসামরিক অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতেই উঠে এসেছে। এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে এক সামান্য মেজরের অসামান্য অবদানের কথা। তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অপপ্রচার শুরু হয় স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে। একটু পেছন ফিরে এই বিতর্কের ভিত্তিটাও একটু দেখে নেই।

বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক আবদুশ শাকুর তাঁর আত্মজীবনী “কাঁটাতে গোলাপও থাকে” বইতে উল্লেখ করেছেন – “…হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে টিকোজি থেকে পানি ঢেলে চা বানানোর নামে এটা সেটা নাড়াচাড়াই করতে থাকলাম আনমনে। এমনি সময় টেবিলের ‘এগারো ব্যান্ড স্যানিও রেডিও’তে আচমকা শ্রুত হল সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাঃ “আমি মেজর জিয়া বলছি।” লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে দু’জনে প্রাণভরে কোলাকুলি করলাম, যেন পুনরুজ্জীবিত দুই মৃত সৈনিক।”

কর্নেল (অবঃ) কাজী-নুর-উজ্জামান তাঁর “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধঃ একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা” গ্রন্থে লিখেছেন, “৭১-এ এপ্রিলের শেষ দিকে তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমি মেজর জলিলের নয় নম্বর সেক্টর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। যাত্রী আমরা দুজনই ছিলাম। …তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর হয়ে কেমন করে কখন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন?’ জবাবে আমি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কথা বলি। জিয়া কর্তৃক নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে পরিচয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করি। আমার জবাবে তিনি নিরুত্তর ছিলেন এবং অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। …জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনেই আমি ও আমার মতো হাজার হাজার সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্য প্রেরণা পেয়েছিল। জিয়া ছিলেন ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার। তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের দাবি করা আমাদের মনে প্রভাব ফেলেনি। তবে তাঁর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিল।”

এ ব্যাপারে এমন আরও অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। তবে বিষয়টি এমন না যে এই তথ্যগুলো তাদের কাছে নেই। এসব কিছু জানা থাকার পরেও তারা গোয়েবলসের নীতি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঠিক যেভাবে উনিশশ পঁচাশি সাল থেকে অপপ্রচার আরম্ভ করে তারা মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদীকে বাংলাদেশের দিয়েছে। এ অপপ্রচারকে কেবলমাত্র সাধারণ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ভাবলে মারাত্মক ভুল হবে। এই অপপ্রচার শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে নয় এর পেছনে রয়েছে গভীর এক নীলনকশা, রয়েছে আমাদের জাতিস্বত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশী জাতিস্বত্তার স্থপতি ও নির্মাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং সবসময় সুকৌশলে তা প্রতিহত করেছিলেন। তাই আজ এই জাতির নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌম স্বত্তাকে ভুলিয়ে দিতে হলে যে কোন ভাবেই হোক জিয়াউর রহমানের আদর্শকে মুছে ফেলতে হবে।

এই ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায় উনিশশ সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পরপরই। সেসময় সেপ্টেম্বর মাসে বম্বেতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের CWC) এক সভায় সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ নিয়ে একটি রেজুলিউশন গ্রহণ করা হয়। সেই রেজুলুশনে বলা হয়, “We hereby decide to accept the present partition for the time being”। এখানে “ফর দি টাইম বিং” কথাটার মাধ্যমে আমাদের প্রতিবেশীরা মূলত তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। এবং এ সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবেই তারা একে একে হায়দারাবাদ, সিকিম ও ও কাশ্মীরকে গিলে ফেলেছে।

আশার বিষয় হচ্ছে আমারা সিকিম নই, আমরা হায়দারাবাদ কিংবা কাশ্মীরও নই। সেই আদি যুগ থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা। এই অঞ্চলের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল মহাপরাক্রমশালী মহারাজ আশোকার বিরুদ্ধে। তারা ঢুকতে দেয়নি দখলদার যুদ্ধবাজ মানসিংহদেরকে। ইংরেজদের দুই’শ বছরের শাসনকাল কেটেছে এই অঞ্চলের তিতুমির, ফকির মজনু শাহ, নুরুলদিন, বাকের মোহাম্মদ জং এবং সুর্যসেনদের বিদ্রোহ-সংগ্রাম দমন করার চেষ্টায়। উর্দুভাষী পাকিস্তানও পারেনি আমাদের পদানত করতে। সুতরাং দিল্লীও পারবেনা। কারণ এই দেশে রয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতই সামান্য অনেক মানুষ যারা ফ্যাসিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসামান্য তীতিক্ষার সম্ভাবনা ও মহত্তম মুক্ত মানুষের সাহসকে ধারণ করে বলে উঠতে পারে, “উই রিভল্ট!”

তথ্যসূত্রঃ

১। ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ভাবনায় বাংলাদেশ, হাসি প্রকাশনী, মে ২০০৯, পৃঃ ১৪৯।
২। ইঞ্জি: মোশাররফ হোসেন, ফেলে আসা দিনগুলি, তৃপ্তি প্রকাশ কুঠি, জুন ২০১১, পৃঃ ১৪৯-১৭২।
৩। এবিএম মূসা, জিয়ার দর্শন ও বাংলাদেশ, সম্পাদনাঃ  কাজী সিরাজ,  অ্যাডর্ন পাবলিকেশন,  ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃঃ ১৯-২৫।
৪। হেলেনা খান, ঊষা থেকে গোধূলির স্মৃতি, মীরা প্রকাশন, মার্চ ২০০৯, পৃঃ ২৬০।
৫। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ।
৬। আবদুশ শাকুর, কাঁটাতে গোলাপও থাকে, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃঃ ১৭৫-১৭৭।
৭।  কর্নেল (অবঃ) কাজী-নুর-উজ্জামান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধঃ একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা,  অবসর  প্রকাশনা সংস্থা, ফেব্রুয়ারী ২০০৯, পৃঃ ১৩-১৫।

*লেখক শিবলী সোহায়েল -শিক্ষক ও গবেষক, চার্লস ষ্টার্ট ইউনিভার্সিটি, অষ্ট্রেলিয়া।

 

সেনানিবাসে ব্যাংক ডাকাতি এবং অপরাপর প্রসঙ্গ

ঢাকা সেনানিবাসের অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে অবস্থিত একটি বেসরকারী ব্যাংকের বুথে নিরপত্তা প্রহরীকে হত্যা করে সব টাকা লুট হয়েছে! বিষয়টি দেশবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে! সেনাভবনের পার্শ্বে, পুরাতন ডিজিএফআই হোডকোয়ার্টারের বিপরীতে, সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট ব্রাঞ্চের পার্শ্বে  এহেন দুর্ধর্ষ ঘটনা জানান দিচ্ছে- সেনাবাহিনী ও সেনানিবাসের নিরাপত্তা ঠিকঠাক মত কাজ করছে না। সেনাভবন অর্থাৎ, সেনাবাহিনীপ্রধানের বাসভবনের আশে পাশে কড়া পাহারা, তথা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা থাকার কথা। কেতাবে লেখা থাকলে বাস্তবে নিশ্চয়ই সিস্টেমে বড় ধরনের গোলমাল আছে। আগে ধরে নেয় হতো, ক্যান্টনমেন্ট এমন একটি যায়গা, যেখানে আর যাই হোক, নিরাপত্তার কোনো সংকট নেই। চোর ডাকাত দূরের কথা, কোথাও কিছু রাস্তায় পরে থাকলেও কেউ তুলে নিবে না। অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে- সেযুগ হয়েছে বাসী।

ঢাকা সেনানিবাসের ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় দীর্ঘকাল বসবাস করায় এর অলিগলি সব চেনা, মুখগুলোও পরিচিত।সেনানিবাসে ঢুকতে বেরুতে সিভিলিয়ানদের যে কী হাঙ্গামা, তা ভুক্তভোগিমাত্রই জানেন বুঝেন। তদুপরি সিসিটিভি ও লেটেস্ট যোগাযোগের এই যুগে অস্ত্রশস্ত্রসহ ডাকাত ঢুকে সেনাপ্রধানের বাড়ির কাছে পৌছে অপারেশন চালিয়ে খুনাখারাবি করে ব্যাংকের টাকা লুট করে কোনো ধরা পড়া ব্যতিরেকেই নিশ্চিন্তে বাইরে চলে যেত পারার ঘটনা বলে দিচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তা বলতে আর কিছু নাই। সেনানিবাসও এখন নিরাপদ নয়। আরও বড় কোনো ঘটনা ঘটার আলামত নয় তো? যদিও এখন দেখা যাবে, আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের এবং এমপি ইউনিটের কিছু ছেলেদের রগরানো হচ্ছে, কিছু এক্সট্রা টাইট, কয়েকদিন পরে আবার যেই সেই।

একটা ঘটনার কথা বলি। কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোক মতিঝিল থেকে একটা উবার ভাড়া করলেন। ভাঙা বাংলায় বলেন- ক্যান্টনমেন্ট চলো। ড্রাইভার রাজী হয় না। বলে- ক্যান্টনমেন্টের পাশ নাই। যাত্রী বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তোর পাশের দরকার হবে না, আমি আছি তো, দ্যাখ কি করি।’ পথে টুকটাক কিছু আলাপে বোঝা গেলো, তিনি কোলকাতার মানুষ, এবং ভারতীয়। গাড়িটি ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ জাহাঙ্গীর গেটের কাছাকাছি আসলে আরোহী বললেন, ‘সোজা যাও অর্থাৎ, ফ্লাগ কার লাইন দিয়ে!’ ড্রাইভার ভয় পেয়ে বলে, ‘স্যার, বলেন কি আপনি? তা সম্ভব নয়। আমার বিপদ হবে।’ আরেহী আশ্বস্ত করে বলে, ‘তুমি যাও, কোনো সমস্যা হবে না, দেখো আমি কি করি!’ মিলিটারী পুলিশ (এমপি) সদস্য যথারীতি ফ্লাগ লাইনে গাড়িটি থামায়, ছুটে আসে সিকিউরিটি ইিউনিট, ডিজিএফআইর সদস্যরা এবং পরিচয় জানতে চায়। আরোহী তার পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ডের মত কাগজ বের করে দেখায় (ওটাতে কোনো ছবি ছিল না, বা আইডি কার্ডও নয়)। এমনকি আরোহী গাড়ির কাঁচও নামিয়ে কথা বলেনি। ওটা দেখেই এমপি গাড়ি ছেড়ে দিলো। ড্রাইভার এবার বুঝে গেলো আরোহি হোমড়া চোমড়া কেউ হবে। এবার ক্যান্টনমেন্টের নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে পৌছলে দেখা যায় কয়েকজন সেনা অফিসার তাকে রিসিভ করতে দাড়িয়ে আছে। এই হলো সেনানিবাসের বর্তমান সিকিউরিটির হাল!

ঢাকা সেনানিবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোথায় এসে ঠেকেছে, তা বুঝতে এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট। এর বাইরে, বেশ কয়েকবছর ধরে নানা মাধ্যমে খবর বের হয়েছে, ক্যান্টনমেন্টগুলিতে প্রতিবেশি দেশের গেয়েন্দা সংস্থা র-য়ের অবাধ বিচরণ। কচুক্ষেতের ডিজিএফআই অফিসের একটি ফ্লোরে ভারতীয় বাহিনীর মেজর জেনারেল সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক ডজন অফিসার বসে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার আগামাথা ঠিক করে থাকেন। বাংলাদেশ আর্মি অনেক অগেই কর্পোরেট আর্মিতে পরিণত হয়েছে। এদেশের সেনাবাহিনীর সাধারণ থেকে নীতিগত বিষয়ে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা ও সেনারা ভূমিকা রেখে থেকে। এমনকি সেনাবাহিনীর গতিবিধি সংক্রান্তে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয় বাংলাদেশ বাহিনীর কর্তাদের। গত দু’টার্ম ধরে আর্মিতে চলা ক্লিনজিং মিশনে ভারতীয় বাহিনীর লোকেরা সশরীরে উপস্থিত থাকে। মেজর জিয়াউল হক, লে. কর্নেল যায়েদী, লে. কর্নেল হাসিনুরের মত কয়েকডজন সার্ভিং সেনা অফিসারকে অপহরণ, মাসের পর মাস আটক, এবং জিজ্ঞাসাবারে নামে টর্চারের সময় উপস্থিত থাকে হিন্দিভাষী ভারতীয় গোয়েন্দারা!

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী বলতে যে কঠোর কঠিন সার্ভিসকে বোঝাতো, সেখানে এখন স্থান দখল করেছে অঢেল টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, হাইরাইজ মাল্টিস্টেরেড ভবন, নানা উপায়ে বিত্ত বৈভবের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত আরাম আয়েশ, মোটা চাকার পাজেরো গাড়িতে পারিবার নিয়ে হৈ হল্লা, আড্ডাবাজি, পার্টি, চাকরির পরে ব্যবসা বানিজ্যের হাতছানি ইত্যাদি। এখনকার কান্টনমেন্টে গেলে মনে হয় কোনো বাহিনীর এলাকা নয়, বরং হয় কোনো পর্যটনকেন্দ্র বা সেভেনস্টার হোটেলের আঙিনা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেনাবাহিনী এবং সেনানিবাসের এই দশা হঠাৎ করে হয়নি। খুব পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে করা হয়েছে। পিলখানা ম্যাসাকার পরবর্তী সেনাবাহিনীর ভেতরে অনেকেই দেখছেন অপেশাদারী একটি মেরুদন্ডহীন ডিপার্টমেন্ট। আজকাল পুলিশের হাতে সেনা অফিসার ও সদস্যদের পথ ঘাটে প্রহার খাওয়ার যে প্রবণতা, তা একই সূত্রে গাথা। বাংলাদেশের একটি আতেল শ্রেণী আছেন, যারা জোরেসোরেই প্রচার করে থাকেন, বাংলাদেশে সেনাবাহিনীরই দরকার নাই। আবার সরকারী দলের আজন্ম ক্ষোভ- তাদের জনকের হত্যাকারী বাহিনী হলো সেনাবাহিনী। কাজেই এই বাহিনীকে যেকোনো ভাবে দমন করে রাখতে হবে, পারলে বিলুপ্ত করো। সেনাবাহিনীতে যতই পরিবর্তন বা রক্ত বদলাক না কেনো, বিনা ভোটের প্রধানমন্ত্রী এখনও তাদের ভয়েই ঠিকমত ঘুমাতে পারেন না!

আজকের ঘটনার পরে প্রশ্ন উঠতে পারে, কালকের ঘটনা কি কেবল একটি ডাকাতি? নাকি বড় কোনো ঘটনার পূর্বাভাস? এরপরে সেনাসদরের ভেতরে অফিসাররা খুন হলেও বা পিলখানার মত কোনো ঘটনা ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। হু ইজ নেস্কড? ইজ ইট অ্যা ফুল ড্রেস রিহার্সাল? গত এক দশকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে প্রতিবেশিদের অনেক টেনশন হ্রাস পেলেও এবারে ৫০০ কোটি টাকার পুরোনো অস্ত্রের ভাগাড় বানিয়ে এসব পালিশ করার কাজে ব্যস্ত রাখার এক মহৎ পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই হাতে নেয়া হয়েছে। দরকার হলে এর জন্য ট্রেনিং নিতেও যেতে হবে প্রতিবেশীরই কাছে, বাইরে যাওয়ার পথ রুদ্ধ। প্রতিরক্ষা চুক্তির নামে বেঁধে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে। কেবল বাকী আছে এটিকে তাদের সাবসার্ভিয়েন্ট বাহিনী হিসাবে অফিসিয়াল ঘোষণা!

প্রায় নিরাপত্তাহীন দেশ। এ অবস্খায় দেশ ও জাতীয় সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হলে আর দেরী নয়, এখনই সময়। উঠে দাড়ান।

লে.জে. আজিজ পরবর্তী সেনাপ্রধান?

লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদকে পরবর্তী সেনাপ্রধান নির্বাচন করেছেনে শেখ হাসিনা! খবর বিশ্বস্ত সুত্রের।

জেনারেল আজিজের চেয়েও আর চার জন সিনিয়র কর্মকর্তা রয়েছেন। তাছাড়া টেক্সটাইল কলেজে অধ্যয়নকালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন আজিজ। এসব জানা সত্ত্বেও আজিজেই আস্থা রাখতে চান শেখ হাসিনা। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিনাভোটের একতরফা নির্বাচনের সময় জেনারেল আজিজ বিজিবির মহাপরিচালাক থাকাকালে যেভাবে সার্ভিস দিয়েছেন, তা স্মরণ করেই হাসিনার এ নির্বাচন।
 
তবে আজিজের এ নির্বাচনের জন্য হাসিনা কোনো রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা সাপোর্ট পাননি। তাই তার নিজস্ব সিদ্ধান্তেই এ নিয়োগ হতে যাচ্ছে।
 
সম্প্রতি সেনাপ্রধানের চাকরির মেয়াদ ৩ বছর থেকে ৪ বছরে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বেলালের চাকরির মেয়াদ আরও এক বছর বেড়ে গিয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত হওয়ার কথা। কিন্তু আগামীতে নির্বাচনের জন্য হাসিনা জেনারেল বেলালের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে সেনাপ্রধানের ভাই ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে সরকারের উপর বেলালের সন্দেহ রয়ে গেছে। তাই বেলালকে চতুর্থ বছরের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। আগামী ২৫ শে জুন সেনাপ্রধান পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।
 
তবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস ও জোসেফের ভাই আজিজকে সেনাপ্রধান করা হলে সেনাবাহিনীর মানসম্মান ভূলুন্ঠিত হবে বলে বাহিনীর মনে করার যথেষ্ট কারন আছে!

 

এবার সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ও সেনা সদস্যকে পুলিশের পিটুনি!

সেনাবাহিনীর মেজরকে পুলিশের মারপিটের ঘটনার উত্তেজনার মধ্যেই এবার রাজশাহীতে সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার এবং সৈনিককে লাঞ্ছিত করে পুলিশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা দশটার দিকে ঘাটাইল সেনানিবাসে ৯০২ কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপে কর্মরত ওয়ারেন্ট অফিসার শাহআলম এবং তার পুত্র সৈনিক আমিনুল তাদের বাড়ি চারঘাটে থেকে মোটর সাইকেলে করে রাজশাহীর দিকে যাচ্ছিল। পতিমধ্যে মতিহার থানা পুলিশ তাদের থামিয়ে হেলমেট না পড়ার কারনে আটক করে এবং পরে মামলা দেয়। সেনাসদস্য পিতা পুত্র তাদের পরিচয় দিলে পুলিশের এএসআই আশরাফ গালাগালি করে। এমনকি এক পর্যায়ে তুই তোকারি করে বলে- আর্মির মেজর পিটাইলেই কিছু হয় না, আর এ তো সৈনিক! সেনা সদস্য আমিনুল এর প্রতিবাদ করলে এক পর্যায়ে এএসআই আশরাফ তাকে চড় থাপ্পড় শুরু করে, পরে শুরু করে মারপিট। অন্য পুলিশ সদস্যরাও এতে সামিল হয়। থামাতে গিয়ে পিতা শাহ আলমও প্রহারের শিকার হয়।

ঘটনাস্থল থেকে বিষয়টি সেনাবাহিনীর উর্ধতন মহলে জানানো হয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অকুস্থলে পৌছে। পরে ঘাটাইল সেনানিবাস থেকে মিলিটারী পুলিশ গিয়ে আহত ওয়ারেন্ট অফিসার এবং সৈনিককে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।

পুলিশের হাতে একের পর এক সেনা নিগ্রহের  ঘটনায় সেনা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, ও উত্তেজনা বেড়েই চলছে।

সেনাবাহিনীর কর্মরত মেজরকে পিটিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ!

গত রবিবার রাতে ঢাকা বগুড়া হাইওয়েতে চন্দ্রার কাছাকাছি ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম হলে দুই ট্রাফিক পুলিশ উল্টো দিক থেকে কিছু গাড়িকে প্রবেশ করতে দিলে জ্যামে আটকাপড়া সেনাবাহিনীর ১৯তম ডিভিশনের মেজর মুনিরের সাথে ঐ দুই পুলিশের বচসা হয়। এক পর্যায়ে মেজর মুনিরকে পিটিয়ে পুলিশদ্বয় তাকে থানায় নিয়ে যায় এবং সেখানেও নির্মমভাবে পেটানো হয়।

মেজর মুনির এএসসির একজন অফিসার। বর্তমানে এমআইএসটিতে কর্মরত। তার স্ত্রীও সেনা কর্মকর্তা। ঘটনার রাতে তিনি ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঢাকা ফিরছিলেন।

খবর পেয়ে মিলিটারি পুলিশের কম্যান্ডিং অফিসার তাৎক্ষণিক সেই স্পটে চলে যান এবং ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত দুই পুলিশকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসার জন্যে একটি মিলিটারি গাড়িতে ওঠানো হয়। তখন ১৫ জন পুলিশ মিলিটারি পুলিশদেরকে বাধা দিলে আরো ১৪ জন মিলিটারী পুলিশ এবং ৩ জন কাউন্টার টেররিজম সদস্য অস্ত্র শস্ত্র সহ ঘটনাস্থলে পৌছায়। দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থায় পৌছলে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল অাকবরের কাছে টেলিফোন করে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেন। ডিআইজি ঢাকা রেঞ্জকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। আইজিপির কথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে অভিযুক্ত দু’পুলিশকে রেখে আর্মি প্রভোস্ট মেজর মুনিরকে নিয়ে ফেরত আসে।

এরপর সেনাবাহিনী প্রধান, ৯ ডিভিশনের জিওসি এবং পুলিশের আইজিপির মধ্যে দফায় দফায় টেলিফোন আলাপ হয়।আজ সোমবার ঢাকার ডিআইজি আবদুল্লাহ আল-মামুন কয়েকবার সাভারের জিওসির সাথে দেখা করার জন্যে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাকে সময় দেয়া হয়নি। বরং মিলিটারি পুলিশ অফিস-২ এর সাথে বসার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অভিযুক্ত দুই পুলিশকে নিকস্থ পুলিশ ফাড়িতে ক্লোজ করা হয়েছে। ভিকটিম অফিসারকে কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আইজিপি নিজে ফোন করে সুযোগ পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে চরম হতাশা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। জুনিয়র সেনা অফিসাররা খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।

একটি প্রমাদ সংশোধনী: পিলখানা ষড়যন্ত্রে জড়িত ৪৪ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল শামস সঠিক আবিস্কার!

বাংলাদেশ সেনাবাহীনির বর্তমান ব্রিগেডিয়ার শামসুল আলম চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৪ লং কোর্সের অফিসার। ২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় যারা ভিতর থেকে ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তার অন্যতম ছিলেন বিডিআরের ৪৪ রাইফেল’এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেনেন্ট কর্নেল শামস। এই ৪৪ রাইফেলের সৈনিকরাই পিলখানায় সেদিন প্রথম বিদ্রোহ করে এবং মূল হত্যাযজ্ঞ চালায়। পিলখানায় দরবার হলে আটক শতাধিক অফিসারের মধ্যে শামসও একজন ছিলেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে পরে অক্ষত অবস্খায় ফিরে আসেন। উদ্ধার হওয়ার পরে তার মুখে সন্দেহজনক কথাবার্তা শুনে সেনাঅফিসাররা ধারনা করেছিলেন, শামস বিদ্রোহের খবর আগেই জানত। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শামসের কাজে খুশি হয়ে তাকে পদোন্নতি দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের পোস্টিং শেষ করে তাকে পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাভার পোস্টিংয়ে- মিনিষ্টার কনস্যুলার পদে কর্মরত ছিলেন চার বছর। পাসপোর্ট ভিসা কেলেঙ্কারী করে অবৈধ অর্থ আয়, এমনকি স্থানীয় বাংলাদেশীদের ব্যবসায়ীদের সাথে আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। ওয়াশিংটনে থাকাকালে প্রবাসী ব্যবসায়ীদেরকে বাংলাদেশে ব্যবসা পাইয়ে দিবে (বিশেষ করে আইটি খাতের) বলে অনেকের ব্যবসার শেয়ার হোল্ডার হন। তার ক্ষমতার উৎস হিসাবে দাবী করেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে, তিনি নাকি তার ভার্জিনিয়ার বাড়িতে যাওয়া আসা করেন। পার্টনারশীপ থেকে কোনো ব্যবসায়ীকে ব্যবসা থেকে আউট করতে চাইলে শেষে তারা নিজেদের ক্ষতি স্বীকার করেও শামসের হাত থেকে মুক্তি নেন। শামস নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে ওয়াশিংটন থেকে দেশে ফিরতে চাননি। প্রচুর অর্থ খরচ করে আমেরিকায় এডযাস্ট হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। বিদেশ পোস্টিং শেষ করে এসে ব্রিগেডিয়ার পদোন্নতি, এবং এনএসআইতে পোস্টিং। এখানেও বিরোধী দলের নেতাকর্মী অত্যাচার নির্যাতনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন শামস।

তবে এতকাল ধরে একটি ভুল তথ্য প্রচার হয়েছিল, আর তা হচ্ছে- এই বিডিআরের ৪৪ রাইফেলসের শামস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার শামসুজ্জামানকে, যিনি ১৩ লংকোর্সের অফিসার। এর মূল কারন ছিল ব্রিগেডিয়ার শামসুজ্জামান এবং কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরী দু’জনে একই সময়ে ওয়াশিংটন দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। দু’জনেই ‘শামস’ লিখতেন। তবে ১৩ লংয়ের শামস ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এবং মিলিটারী এটাশে হওয়ার কারনে- বেশি এক্সপোজড! অন্যদিকে ১৪ লংয়ের শামস ছিলেন কর্নেল, ডিজিএফআইর কাভার পোস্টিংয়ে মিনিস্টার কনস্যুলার। তিনি থাকতেন সিভিলে। কর্নেল শামস তার সামরিক র‌্যাংক পরিচয় উল্লেখ করতেন না, ফলে অনেকে তাকে সিভিলিয়ান অফিসার হিসাবে ভ্রম করতো। তেমনই ভ্রমাত্মকভাবে অনেকেই ১৪ লংয়ের শামসের দায় ১৩ লংয়ের শামস এর উপর চাপিয়ে দিয়ে বসে আছেন। ১৩ লংয়ের শামসুজ্জামান এখন মেজর জেনারেল।

মানবাধিকার লংঘনের দায়ে বাংলাদেশ সরকারের মনোনীত ডিফেন্স এটাশের নিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের অসম্মতি!

বাংলাদেশে গুম খুন ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট খুব কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে ডিফেন্স এটাশে হিসাবে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে পদায়নের প্রস্তাব দিলে স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে জানানো হয়- ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাই তাকে যুক্তরাষ্ট্র ঐ পদে গ্রহন করবে না। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার এবং সেনাবাহিনীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে!

২০১৭ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কান্ট্রি রিপোর্টে বাংলাদেশ সরকারে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড নিয়ে ব্যাপক তথ্য তুলে ধরা হয় এবং বিভিন্ন বাহিনী নির্যাতন ও মানবাধিকার লংঘন করেও পার পেয়ে যায় মন্তব্য করা হয়েছে।

কেবল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনই নয়, জাতিসংঘ সদর দফতর জানতে পেরেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা র‌্যাব এবং বিভিন্ন অবস্থানে থেকে খুন, গুম ও মানবাধিকার লংঘনে জড়িত থাকার পরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দলে যোগ দিয়ে তাদের অপরাধ লুকানোর চেষ্টা করে। এসংক্রান্তে একাধিক লিখিত অভিযোগের পরে শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেস্ক থেকে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া র‌্যাবের বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড নিয়ে সুইডিস রেডিওর দীর্ঘ প্রতিবেদনের পরে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ফলে মানবাধিকার লংঘনের নানা অভিযোগে বাংলাদেশের পুলিশের সাথে সাথে সেনাবাহিনীকেও শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিয়োগের ওপরে নিষেধাজ্ঞায় আওতার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া মানবাধিকার লংঘনের দায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ বন্ধ করে তদস্থলে ভারতীয়দের কোটা বাড়ানোর জন্য ভারত সরকার অনেক আগে থেকে জাতিসংঘে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

গভীর রাতে বিজিবি মহাপরিচালক বদলী! জনমনে শংকা- আবার পিলখানা ম্যাসকারের আলামত নয় তো?

1 2 3